x

এইমাত্র

  •  তিন পার্বত্য জেলায় সেনাবাহিনীর ছেড়ে যাওয়া ক্যাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  •  মিয়ানমারে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি, নিহত ৬
  •  ইউপি নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি: ফখরুল

গ্রাম মফস্বলে ডাক্তার একাই কেন যাবেন?

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:২০

আমাদের গুণী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাতা হানিফ সংকেতের ইত্যাদিতে 'ডাক্তার ভাই' এড্রিক বেকারকে নিয়ে দেখানো এক বিশেষ পর্ব দেখে সবাই বলছেন দেশী ডাক্তার মশাইরা সত্যি আমাদের বড়ো লজ্জায় ফেলে দিলেন। প্রত্যন্ত গ্রামে সেবা দিতে আমেরিকা থেকে উড়ে এসেছেন জেসন-মারিন্ডি ডাক্তার দম্পতি।

দুজনেই আমেরিকার নামকরা প্রতিষ্ঠান উইসকনসিন ও ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমায় পড়াশোনা করেছেন। অথচ আমাদের পুরান ঢাকার সলিমুল্লাহ আর ঢাকা মেডিকেলে পড়ুয়া ডাক্তাররা গ্রাম মুখো হন না। গ্রাম তাদের কাছে এখনও নির্বাসনে যাওয়ার মত। খোদ সরকার প্রধান বারবার কড়া ভাষায় বললো তবু তারা কথা শোনেন না। আসল ঘটনা বা বাস্তবতা হলো ডাক্তার মশাইরা একা নন, সকল উচ্চ শিক্ষিতেরাই আমাদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন। আমরা কেউই আর গ্রামে ফিরে যেতে চাই না। সামান্য সময়, এমনকি দিন দুয়েকের জন্যেও না। গ্রাম ভালোবাসি না। গ্রাম মফস্বলে কারো পোস্টিং হলে দৌড় শুরু হয়ে যায় দ্রুত বদলির তদবীরের জন্য। চৌদ্দ পুরুষের ভিটে মাটি শেকড়, শ্মশান, গোরস্তান গ্রামে হলেও গ্রাম আমাদের কাছে অবহেলা ও অনাদরে একবেলা ফিরে তাকাবারও কোন স্থান বলে মনে হয় না। গ্রাম জলকাদায় ভরা, কর্দমাক্ত, ধুলি ধুসরিত, অন্ধকারাচ্ছন্ন, মরা ও মারিতে পূর্ণ। আমাদের চির অবহেলিত দুঃখিনী মায়ের মতো।

আমার নিজেরই এমন অনেক আত্মীয় স্বজন আছেন যাদের দেখেছি কোনদিনই আগ্রহ নিয়ে তাদের সন্তানকে গ্রামে নিয়ে যান নি। শহরেই বড় করেছেন। সন্তানকে ইউরোপ আম্রিকার উপযুক্ত করতে নির্ঘুম থেকেছেন। আপনার সন্তানকে গড়ে তুলবেন আমেরিকা আর কানাডার উপযোগী করে আর সোনার বাংলার জন্য হাহাকার করবেন—এ হয় না, হয় না গো মশাই। মা-বাবার সবচেয়ে মেধাবী ছেলে বা মেয়েটা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় বা জোরপূর্বক বানানো হয়। তারচেয়ে অনেক ঢের অমেধাবী অফিস কেরানীও এখন আর গ্রামে যেতে চান না। রাজউকের এক খন্ড প্লট আর ফ্লাটের জন্য এমপি, মন্ত্রী, সরকারি বড় বড় কর্মকর্তাদের কি কামড়াকামড়ি আর ধরাধরি। ছোট দেশ। পূর্বাচলের মতো প্লটগুলো দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে করলে সমস্যা কি? বলবেন, তা কি আর হয়। তা যদি হয় না গো মশাই, তবে সবচেয়ে মেধাবী ছেলে বা মেয়েটা গ্রামে গিয়ে জনগণকে সেবা দেবে কোন আক্কেলে এ প্রত্যাশা করেন? বড় হওয়ার প্রতি মুহুর্তে তাকে বাবা মা, সমাজ কানে কানে বলেছে, শিখিয়েছে গ্রাম ছাড়ো। এদিকে এসো না, এসো না। বড় বড় আলো ঝলমলে শহর, নগর, বন্দর তোমাকে ডাকছে, ডাকছে, ডাকছে...।

এই দূষিত, বাস অযোগ্য, ভয়ানক ঘিঞ্জি, অপরিকল্পিত, মমতাহীন নগরীর চেয়ে গ্রাম মফস্বল এলাকা এখনও অনেক সবুজ সুন্দর। আছে মুক্ত বাতাস, উন্মুক্ত আকাশ। বিশুদ্ধ প্রাণ, প্রকৃতি ও সবুজের স্নেহে পল্লবিত চারদিক। কিন্তু এই চিরায়ত বাংলার দুর্লভ সুন্দর উপভোগ করার নান্দনিক মনস্তত্ত্ব(Aesthetic Psychology) আমাদের মধ্যে গড়ে তোলা হয় নি। উল্টো বাবা-মা ছেলে মেয়েদের মধ্যে অবচেতন মনে গ্রাম সম্পর্কে, গ্রামে ফেলে আসা স্বজন সম্পর্কে এক ধরনের ভুল বার্তা দেন, এমনকি বিদ্বেষ বা ঘৃণার জন্ম দেন। তাচ্ছিল্যেভরা মনোভাব ও অবহেলা নিয়ে বড় হয় নগর সন্তানেরা। গত পনের বছরে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল আমূল বদলে গেছে। পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা সবই গ্রামাঞ্চলে গেছে। প্রতিষ্ঠা হয়েছে স্কুল কলেজ মাদ্রাসা কিন্তু যোগ্য মানুষের বড় অভাব।

উপনিবেশিত বাংলায় গ্রাম ও কেন্দ্রের পার্থক্য ছিল বিস্তর। এখন গ্রাম আর উপনিবেশ আমলের মতো বিচ্ছিন্ন না। গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য দিয়ে লেখার ইতি টানি। বাঙালির চিরকালের মহত্তম প্রতিভার নাম রবীন্দ্রনাথ। সদ্যবিকশিত মধ্যবিত্ত প্রতিষ্ঠাকাঙ্ক্ষী লেখক ও শিল্পীরা যখন কলকাতায় কামড়াকামড়ি করছেন তখন রবীন্দ্রনাথ কলকাতা ছেড়ে পদ্মা পাড়ে বাংলাদেশের নিভৃত গ্রামাঞ্চল শিলাইদহে জমিদারি দেখার ছলে অবস্থান করছেন। চিরায়ত বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন উপভোগ করেছেন। রচনা করছেন তাঁর অনবদ্য সব কাব্য, গান, ছোট গল্প। যা মহাকালের সোনারতরীতে ঠাঁই পাবে। রবীন্দ্রনাথ জীবনের এক চতুর্থাংশ সময় ছিলেন কলকাতায় বাকি সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশের শিলাইদহে, পতিসরে, শাহজাদপুরে, শান্তিনিকেতনে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ হতে পেরেছিলেন। না হলে কামড়াকামড়ি করা মিডিওকোর বাঙালি এক লেখক, বুদ্ধিজীবী অথবা সাংবাদিক হতেন। বাঙালির হাজার বছরের আরেক শ্রেষ্ঠ প্রতিভা বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে একটু শান্তি আর স্বস্তির আশায় নিভৃত সাওতাল পল্লীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ডাক্তার বাবুদের একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। এ ব্যর্থতা শিক্ষিত বাঙালি বাবু মাত্রই সকলের। এ প্রসঙ্গে প্রায় শতবর্ষ পূর্বে ১৯২২ সালে রচিত কবিগুরুর গান আজও প্রাসঙ্গিক।

বাঙালির সকল সংকটে, সমরে, সংগ্রামে, ভয়ে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতেই হয়। যিনি জীবনের তিন চতুর্থাংশ সময় গ্রামদেশে কাটিয়েছেন। তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গান বাঙ্গালিকে গাইতেই হবে। যেখানে লুকিয়ে আছে ডাক্তার নিয়ে উদ্ভুত সংকটের সমাধান।


"ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌, ফিরে চল্‌ মাটির টানে-
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।।
যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে, হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,
ডাক দিল যে গানে গানে।।
দিক হতে ওই দিগন্তরে কোল রয়েছে পাতা,
জন্মমরণ তারি হাতের অলখ সুতোয় গাঁথা।"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

লেখকদের নামঃ