হাওরের কথা বলছি, সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওর: পর্ব-০১

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ১৪:৫০

১।
প্রায় এক বছর পর সেই জায়গার ভ্রমণ গল্প লিখতে বসলাম। জায়গাটায় প্রথমবার গিয়েই এতো প্রেমে পড়বো কল্পনাও করিনি। আমার সব সময় এডভেঞ্চার ট্যুরের প্রতি বেশি আকর্ষণ। প্রথম বার পাহাড় বা ঝর্ণায় গিয়ে এতো ভাল লেগেছিল যে ট্যুর মানেই শুধু ঝর্ণা/পাহাড় ভাবতাম। তবে আমার এই জায়গাটা কোনো ঝর্ণা বা পাহাড় না; সমুদ্রও না অবশ্য। অনেকে এটাকে রিলাক্স ট্যুর বলতে পারেন। তবে কিছু এডভেঞ্চার আমি খুঁজে পেয়েছিলাম বটে। হ্যা, হাওরের কথা বলছি। সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওর।

গিয়েছিলাম ১ আগস্ট ২০১৮ তে। একদম ভরা বর্ষা ছিল তখন। ছিলাম ২৩ জন। কিছু চেনা মুখ আর কিছু একদম অচেনা মুখ। তবে ট্যুর শেষে আর অচেনা বলার উপায় নেই। এখন সবাই আপন মুখ। যাইহোক, ১ তারিখ রাতে আমরা ২২ জন ঢাকা থেকে রওনা দেই। আর একজন ১ তারিখ সন্ধ্যার গাড়িতে সূদুর চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেয়। খুব ভ্রমণপ্রিয় মানুষ উনি। আর খুব দ্রুত সবার সাথে মিশে যেতে পারেন। আরেকটা কথা না বললেই নয় খুব ভালো গান গাইতে পারেন। চমৎকার মানুষ একজন। বাসে উঠার আগে বরাবরের মতো সবার সাথে পরিচিত হই যদিও আমাদের পরিচয় পর্ব মেসেঞ্জার গ্রুপেই শুরু হয়েছিল। যার ফলস্রুতিতে দুই-তিনজনের নিক নেম ও ঠিক হয়ে যায়। এই ধরুন একজনকে সবাই মিলে জাতীয় দুলাভাই নাম দিয়েছিলাম যা এখনো ডাকি সবাই। যাইহোক সবাই বাসে উঠে যাই। সবাই সিটে বসার পর শুরু হয় আমাদের গল্প। তারপর গান থেকে একেবারে নাচানাচি। সবাই গান পারে এমন অবস্থা হয়েছিল। এই ট্যুরে এবং হাজারীখিল ট্যুরে যেমন গায়ক আর গায়িকা পেয়েছি তেমন আর কোনো ট্যুরে পাই নি। ইয়ে মানে...আমি আর জাতীয় দুলাভাই ডুয়েট একটা গান করেছিলাম অবশ্য। 

শেষ রাতে সবার চোখ লেগে এসেছিল। তবে ভোর ৬:৩০ এ বাস নামিয়ে দিলো সুনামগঞ্জ। নেমেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কবলে পড়লাম। নাস্তা খেতে বসে ফোন দিলাম সেই ভাই কে যিনি চট্টগ্রাম থেকে রওনা হয়েছেন। জানতে পারলাম উনি আসতে আসতে ৮টা/সাড়ে ৮টা বাজবে। এতক্ষন অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না আমাদের। তাই নাস্তা সেরে লেগুনায় রওনা দিলাম তাহিরপুরের উদ্দেশ্যে। শুরু হলো আবার আমাদের সেই গান পর্ব। পথিমধ্যে একটা সুন্দর ব্রিজ পেয়ে সেখানে নামলাম। চারপাশ টা খুবই সুন্দর ছিল। সেখানে আমাদের সুন্দর একটা ভিডিও করা হয়েছিল। এরপর আবার যাত্রা শুরু সেই সাথে চলল আমাদের গান ও।টাংগুয়ার হাওর

বৃষ্টিতে রাস্তা একদম পরিচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। আরো অনেকদূর যাওয়ার পর দেখি রাস্তা উচু নীচু এবং রাস্তার দুই পাশেই পানি উপচে পড়ছে। আগেই বলেছি ভরা বর্ষা, যার কারনে এতো পানি। রাস্তার দুপাশের জায়গাগুলো সব চাষের জমি, এখন পানিতে টইটম্বুর। দেখতে ভীষণ ভাল লাগছিল। প্রায় দু' ঘন্টা পর ৯ টায় পৌঁছালাম তাহিরপুর। একটু হেঁটে ঘাটে গেলাম। আমাদের ট্রলার ঠিক করাই ছিল। ঘাটে গিয়ে ট্রলারে উঠতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে গেল একজন (নাম বলা বারণ)। বেচারা সাজেকে গিয়েও হাজাছরা ঝর্ণায় পড়েছিল একবার।

২। 
ট্রলারে উঠার পর পর আমাদেরকে লাইফ জ্যাকেট দেয়া হলো। প্রত্যেককেই পড়তে হবে এটা। আমাদেরকে জানানো হল, আমরা ওয়াচ-টাওয়ার যাবো এবং সেখানেই গোসল করবো। তাই সবাইকে ড্রেস চেঞ্জ করে নিতে বলা হলো। কয়েকজন ছেলে মাঝিকে নিয়ে চলে গেলো স্থানীয় বাজারে বাজার করতে। মেয়েরা ছাউনির নিচে ঢুকে ট্রলারের জানালাগুলো বন্ধ করে মাথা নিচু করে করে অনেক কষ্টে ড্রেস চেঞ্জ করে নিলাম। তবে সময়টা একটু বেশি ই লাগলো আমাদের। এর মধ্যেই ছেলেরা নক করা শুরু করলো তাদের কাপড় আর ব্যাগের জন্য। ব্যাগ দিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের চেঞ্জ হয়ে গেলে ছাউনির উপর এসে দেখি ছেলেরা গামছা আর লুংগির সৎ ব্যবহার করছে। যাইহোক, সবাই খুব করে ছবি তুলা শুরু করলাম। এরই মধ্যে আমাদের সেই চট্টগ্রামবাসী গায়ক ভাই এসে যোগ দিলেন আমাদের সাথে। ছাউনির উপর সবাই বাকি ছেলেদের বাজার থেকে ফেরার আশায় অপেক্ষা করছি। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। অনেকক্ষন পর তারা আসলে মাঝি ট্রলার স্টার্ট করলেন। শুরু হলো আমাদের হাওরের যাত্রা। সবাই লাইফ জ্যাকেট পড়ে নিল। 

অসীম জলরাশির মাঝে আমরা এগুতে লাগলাম। চারদিকে শুধু জল আর জল। সুনামগঞ্জের প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে বিস্তৃত এই জলরাশি। একে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি বলা হয়। মাঝি মামা কে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি সাধারণত এই হাওর প্রায় ৭ হাজার একর জমি জুড়ে আছে কিন্তু বর্ষার সময়ে এই আয়তন বেড়ে তিন গুণ হয়। প্রায় ৪০/৫০ মিনিট পর আমরা পৌঁছে গেলাম। মাঝি মামা ওয়াচ-টাওয়ারের একটু দূরে নিয়ে ট্রলার থামালেন। বললেন এখানে পানি কম এবং পরিষ্কার তাই এখানেই গোসল করতে। আমি মামাকে বললাম-'মামা ডুববো না তো?' মাঝি মামা বললেন-'নাহ।' আমি তো তারপর মেডেল বিজয়ী সাতারুর মতো দিলাম এক লাফ। তখন ঘটল এক মজার কান্ড। এক লাফে পানির নিচে চলে গেলাম। কয়েক সেকেন্ড পর পানির নিচ থেকে ভেসে উঠলাম। কিন্তু আমার জ্যাকেট ঢিলাঢালা হওয়ায় জ্যাকেট মাথা থেকে উপরে উঠে গেল। আমার মাথা, চোখ পানির উপরে আর নাক, মুখ পানির নিচে। আমার এই অবস্থা দেখে সবাই এক চোট হেসে নিল। আরো কয়েকজনের ও এই হাল হল। একজন তো এমন ভয় পেল যে পাশের একটা গাছে উঠে যে বসল আর নামে না সেখান থেকে। পরে জ্যাকেট টাইট করে নিয়ে দাপাদাপি শুরু করলাম আমরা। 

হঠাৎ কোথা থেকে কিছু ছোট ছেলেমেয়ে ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে আসলো। এসব নৌকায় দুইজন করে উঠা যায়। চাইলে নিজেই বৈঠা বেয়ে ঘুরা যায়। ওয়াচ-টাওয়ারের এপাশ টা অনেকটা সিলেটের রাতারগুল/সোয়াম্প ফরেস্টের মতো। হাওরের মধ্যে মধ্যেই গাছপালা থাকায় বড় ট্রলার দিয়ে ঘুরা যায় না। তাই এই ছোট নৌকায় ঘুরতে হয়। বর্ষাকাল এবং বৃষ্টির সময় হওয়ায় কিছু কিছু জায়গার পানি ভাল স্বচ্ছ পেয়েছিলাম। তবে একদম স্বচ্ছ নীল পানি পাবেন সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরে গেলে। নৌকায় ঘুরা শেষে বাচ্চাদের কিছু বকশিস দিলেই ওরা মহাখুশি।পানিতে দাপাদাপি শেষ করে ট্রলারে উঠতেই মাঝি মামা নিয়ে গেল ওয়াচ-টাওয়ারে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম একদম উপরে। ওয়াচ-টাওয়ার থেকে পুরো হাওর দেখা যায়।অসম্ভব সুন্দর সে দৃশ্য। এরপর আবার ট্রলারে নেমে আসলাম সবাই। এরই মধ্যে বাবুর্চি মামা ট্রলারেই আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের আয়োজন করলেন।

চলবে...

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত