ঈদ আকর্ষণ করবে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ট্রি-অ্যাডভেঞ্চার

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৮, ১৫:০২

সাহস ডেস্ক

সুন্দর প্রকৃতি আর কিছু জীবজন্তুর দৌঁড়ঝাপ দেখা। এই সাদামাটা আয়োজনের পরও প্রতি বছরই ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে।

নাগরিক জীবনে হাঁফিয়ে ওঠা লোকজন একটু স্বস্থি নিতে আসেন এখানে। তবে এবার এই ঢল আরো বেড়ে যাবে বহুগুণ। কারণ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে এবার যুক্ত হয়েছে বিনোদনের আরো একটি উপাদান। যা হলো ট্রি-অ্যাডভেঞ্চার। এতে পর্যটকরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাফেরা করে দেখতে পারছেন বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই ট্রি-অ্যাডভেঞ্চারকে ঘিরে ইতোমধ্যে বাড়ছে পর্যটকের উপস্থিতি। ঈদে এই ট্রি-অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে ছুটে আসবেন হাজার হাজার পর্যটক, এমনটাই প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষের। ইতোমধ্যে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সাতছড়ি উদ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটি।

সাতছড়ি ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তুহিন আহমেদ জানান, ঈদের ছুটিতে এবার রাজস্ব আদায়ে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হবে বলে প্রত্যাশা তার। ঈদের ছুটির তিনদিনে শুধু হবিগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম হবে এই উদ্যানে। প্রতি বছরই এই উদ্যানে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামে। বৃষ্টি বাদল কম হলে তাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

তিনি আরও জানান, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাখ-পাখালির কিচির-মিচির শব্দে আনন্দেই সারাদিন পার্কে কাটাতে পারেন পর্যটকরা। এর সাথে ট্রি-অ্যাডভেঞ্চার যুক্ত হওয়ায় পর্যটকদের আকর্ষণ বেড়ে যাবে বহুগুণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইউএসএইড’র অর্থায়নে এবং বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিস (সিএনআরএস) বাস্তবায়নাধীন ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেমস্ এন্ড লাইভিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের মাধ্যমে রূপ-৪ নামক একটি পর্যটন বিষয়ক গ্রুপের সহযোগিতায় সম্প্রতি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ট্রি-অ্যাডভেঞ্চার নির্মিত হয়। ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি।

ক্রেল প্রকল্পের সাইট ফ্যাসিলিটেটর আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, এই ট্রি-অ্যাডভেঞ্চারে রয়েছে ৫ ধরনের রাইডস। সবক’টি রাইডসের জন্য একজন পর্যটককে দিতে হবে ভ্যাটসহ ১১৫ টাকা। এর ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে হয় হার্নেচ, গ্লাবস, হেলমেট এবং কেডস। পর্যটকদের গাইড করতে রয়েছে নির্দিষ্ট লোক। একজন দর্শকের আগে আগে রাইডস এ থাকেন একজন গাইড। এ ছাড়াও ২ থেকে ৩ জন গাইড থাকেন নিচে। যাতে কোনো পর্যটক ঝুলে গেলে তাকে নিচে নামানো যায়। তবে ৯০ কেজির অধিক ওজন সম্পন্ন মানুষ এতে চড়তে পারবেন না।

তিনি আরো জানান, গত ৯ এপ্রিল এই ট্রি-অ্যাডভেঞ্চার উদ্বোধনের পর থেকে সিলেট বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসছেন এতে চড়তে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বরাতরা জানান, বিভিন্ন ধরনের কাঠ ও মজবুত দঁড়ির ব্যবহারে তৈরী হয়েছে ৫টি রাইড। প্রতিটি রাইডের দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। এগুলো এক গাছ থেকে শুরু হয়ে ২০ ফুট দূরবর্তী অপর গাছে গিয়ে শেষ হয়। ৫টি রাইডে চড়তে হলে একজন পর্যটককে দিতে হবে সর্বমোট ১১৫ টাকা। প্রতিটি রাইডে চড়লে পাওয়া যাবে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সবক’টির দৈর্ঘ্য সমান হলেও এগুলো তৈরী হয়েছে একেকটি একেকভাবে। যেমন- প্রথম রাইডে যে কেউ সহজেই চড়তে পারেন। কারণ, এটিতে চড়লে নড়াচড়া কম হয়। প্রথম রাইডের তুলনায় দ্বিতীয়টি একটু কঠিন। কারণ, এটি নড়াচড়া বেশি করে। মূলত একেকটি রাইড চড়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই চড়তে হয় সামনের রাইডগুলো। তবে কেউ যদি একটি, দুইটি অথবা ৩টি রাইড চড়ে নেমে পড়েনে, পুরো ১১৫ টাকাই দিতে হবে।

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এই রাইডগুলোর মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়ার সময় বানরসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর দেখা মিলে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে থাকার জন্য রয়েছে একটি স্টুডেন্ট ডরমেটরি। এতে ১৮ জন মানুষ থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। একরাতের জন্য মাথাপিছু দিতে হয় ১৫০ টাকা। এছাড়াও এখানে রয়েছে ঘরোয়া পরিবেশের দু’টি রেস্টুরেন্ট। যেগুলোতে শহরের তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া যায় ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার।

এ ছাড়া সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে শ্রীকুটা বাজারে রয়েছে দুটি কটেজ। এগুলোতেও ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে একজন রাত্রিযাপন করতে পারেন। সাতছড়ি বাজার থেকে শ্রীকুটায় যেতে সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া ৩০ টাকা নেয়া হয়। তবে মহাসড়ক থেকে চুনারুঘাটের সাতছড়ি যাওয়ার প্রবেশমুখ শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রীজ এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন মানের হোটেল-রেস্টুরেন্ট।

ঢাকার সায়েদাবাদ অথবা মহাখালী টার্মিনাল থেকে সিলেটের বাসে করে এসে নামতে হবে শায়েস্তাগঞ্জের নতুন ব্রিজ চত্বরে। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিক্সাযোগে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যেই যাওয়া যায় সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। এ ছাড়াও ট্রেনে করে আসলে শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে নেমে সিএনজিযোগে একই সময়ে যাওয়া যায় সাতছড়িতে।

উল্লেখ্য, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ/সংশোধন আইনের বলে ২৪৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে ২০০৫ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা পায়। এই উদ্যানে সাতটি পাহাড়ি ছড়া আছে। সেই থেকে এর নামকরণ হয় সাতছড়ি। যার পূর্বের নাম ছিল রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট।

এতে রয়েছে ২শ’র বেশি গাছপালা। এর মধ্যে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, জাম, জামরুল, সিধাজারুল, আওয়াল, মালেকাস, ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, বাঁশ, বেত-গাছ বেশি।

এ ছাড়াও ১৯৮ প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে এতে। এর মাঝে ২৪ প্রজাতীর স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভয়চর। আরো রয়েছে প্রায় ২শ’ প্রজাতির পাখি। জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ বনাঞ্চলটি নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে পাখি প্রেমিকদের জন্য এটি একটি স্বপ্নভূমি।

এদিকে ঈদ উপলক্ষে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা জাতীয় উদ্যান ও চন্ডিচড়া চা বাগানেও পর্যটকদের আগমন ঘটে। সেখানেও নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

চুনারুঘাট থানার ওসি কে এম আজমিরুজ্জামান জানান, ঈদে চুনারুঘাটের বিভিন্ন পর্যটন স্পট ব্যাপক পর্যটকের সমাগম ঘটবে। সেখানে যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত