জট খুলছে; নিষিদ্ধ হচ্ছেন সাকিব!

প্রকাশ | ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৪০ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:৩৮

অনলাইন ডেস্ক

সামনেই ভারতের সাথে টি-২০ সিরিজ। আছে টেস্টও। তবে একদিনও অনুশীলন করেননি সাকিব আল হাসান। কাপ্তানের এমন ভাবে মাঠে না আসা নিয়ে নানা রকম গুঞ্জন চলছে ক্রিকেট পাড়ায়। নানা রকম ফিসফাস চলছিল জনমনে। বিসিবিও বলেছিল, সাকিব ভারত সফরে যাবে কিনা তা সিদ্ধান্ত নেবে বিসিবি।

তবে এখন যা শোনা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য দুঃসংবাদই বলা যেতে পারে। ১৮ মাসের জন্য নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান। তাকে নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। 

সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রায় দুই বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গড়াপেটার প্রস্তাব পেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু জুয়াড়ির কাছ থেকে পাওয়া সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগকে না জানিয়ে গোপন করেন তিনি। তবে আইসিসির কালো তালিকায় থাকা এই জুয়াড়ির সাথে সাকিবের কথা হয়েছে এমন তথ্য খুঁজে পায় আইসিসি। বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর সম্প্রতি সাকিবের সঙ্গেও কথা বলেন আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন অ্যান্ড সিকিউরিটি ইউনিট (আকসু) প্রতিনিধি।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাকিবও নিজের ভুল স্বীকার করেছেন আকসু তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, জুয়াড়ির প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেননি বলেই জানাননি। বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়াটাই তার জন্য  কাল হয়েছে। সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছেন তিনি।

বিসিবির বেশ কিছু সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, আজ অথবা আগামীকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাকিবের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানাবে আইসিসি। বিসিবি এরই মধ্যে এ বিষয়ে অবগত হয়েছে।

আইসিসি অবশ্য ইতোমধ্যেই সাকিবের বিষয় নিয়ে কি হতে পারে তা জানিয়েছে বিসিবিকে। জাতীয় দলের অনুশীলনে বিরত থাকার ব্যাপারটিও এসেছে আইসিসি থেকেই। 

একাধিক বিসিবি পরিচালকের মাধ্যমে জানা গিয়েছে, সাকিব পরবর্তী সময়ে আকসুকে সহায়তা করায় একটু নমনীয় তারা। শাস্তি ১৮ মাস নির্ধারণ করা হলেও সাকিব আপিল করলে সেটা কমিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বিসিবির সহযোগিতা চাওয়ার পাশাপাশি সাকিব আইসিসির কাছেও ক্ষমা চেয়ে শাস্তি মওকুফের আবদেন করবেন। আইসিসি দুর্নীতি দমন বিভাগের নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে চললে এই শাস্তি ছয় মাসে নেমে আসতে পারে। এটাই এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শাস্তি।

অবশ্য, বিসিবিতে এই বিষয়ে রিপোর্ট এসেছে গত বছরের অক্টোবরে। তখন এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি জানিয়েছিলেন, আইসিসি থেকে একটি রিপোর্ট আসার কথা। তবে, সেই রিপোর্ট কি নিয়ে তা জানানো হয়নি তখন। তবে, গেলো ২২ অক্টোবর এই ব্যাপারে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। সাকিব যে ভারত যেতে পারছেন তা তাও জানিয়েছিলেন। ভারত সফরে নতুন অধিনায়ক পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কথাও উল্লেখ করেছেন পাপন।

এত কিছু যে, বিসিবি সভাপতি এই কয়েকদিনে বলেছেন, তা যে সাকিবের নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে তা এখন আর বুঝতে কোনো সমস্যাও নেই। 

আইসিসির দুর্নীতি দমন নীতিমালায় আছে, কোনো ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, আম্পায়ার, স্কোরার, গ্রাউন্ডসের সদস্য, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংশ্নিষ্ট যে কেউ জুয়াড়ির কাছ থেকে যে কোনো ধরনের প্রস্তাব পেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা আইসিসি বা সংশ্নিষ্ট দেশের ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি দমন কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। যতটা দ্রুত সম্ভব সেটা করার নির্দেশনা আছে। এজন্য প্রতিটি সিরিজ বা টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আইসিসি থেকে ক্রিকেটার এবং অফিসিয়ালদের সচেতন করতে জুয়াড়িদের সম্পর্কে অবগত করা হয়। আইসিসির তালিকাভুক্ত জুয়াড়িদের ছবি ও ফোন নম্বর টানিয়ে দেওয়া হয় ড্রেসিংরুমের পাশে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক সিরিজে আকসুর সদস্য উপস্থিত থাকেন। বাংলাদেশে ঘরোয়া ক্রিকেট মৌসুম শুরুর আগেও আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের নির্দেশনা মেনে খেলোয়াড়, টিম অফিসিয়াল, ম্যাচ অফিসিয়াল এবং গ্রাউন্ডস কর্মীদের সচেতন করা হয়। এ কাজটি করেন বিসিবির দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোর্শেদুল ইসলাম। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং জুয়াড়িদের ছায়া থেকে দূরে রাখতে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ দলের সঙ্গে রাখা হয়েছিল তাকে।

ফিক্সিং প্রতিরোধে আইসিসির সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলোতে সাকিব বরাবরই উপস্থিত ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে চালু হওয়া 'আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস' ভালোই জানা বাংলাদেশ অধিনায়কের। এই নিয়ম অনুসরণ করে আগে একবার জুয়াড়ির ফোন পাওয়ার বিষয়ে আকসু ও বিসিবিকে জানিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই সাকিবই কি-না দুই বছর আগে এত বড় একটা ভুল করে ফেলেছেন। বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, সাকিবকে শাস্তির ব্যাপারে জানিয়েছে আকসু। এ ব্যাপারে বিসিবিও আইসিসির ই-মেইল পেয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে সাকিবের পাশেই থাকবে বিসিবি। এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামউদ্দিন চৌধুরীর ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অবশ্য আইসিসি থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো ই-মেইল প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেননি। বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনকে একাধিকবার ফোন করে পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএস করলেও কোনো উত্তর আসেনি। পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'আইসিসি থেকে একটা কিছু আসবে শুনেছি। তারা কী পাঠাবে, জানি না।'

একইভাবে দু'দিন ধরে পর্যায়ক্রমে সাকিব আল হাসানের মোবাইলে ফোন করেও পাওয়া যায়নি। এসএমএস ছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলেও নীরব থেকেছেন সাকিব। তবে তার একান্ত ঘনিষ্ঠ চারজনের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নাম গোপন রাখার শর্তে তাদের সবাই জানিয়েছেন, যেভাবেই হোক আকসুকে রিপোর্ট করতে ভুলে গিয়েছিলেন সাকিব। পরে আকসু থেকে বিষয়টি ধরা পড়ে। সাকিব নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। শাস্তি ঘোষণার পর তিনি আকসুর কাছে আবেদন করলে বিবেচনা করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন।

আকসুর নিয়মে আছে, কোনো ক্রিকেটার, ম্যাচ অফিসিয়াল, টিম অফিসিয়ালসহ সরাসরি ক্রিকেটে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তি জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অনৈতিক প্রস্তাব না জানিয়ে চেপে গেলে, লুকানোর চেষ্টা করলে বা আকসুর জিজ্ঞাসাবাদেও অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে 'আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন' ধারা ২.৪.২, ২.৪.৩, ২.৪.৪, ২.৪.৫ ও ২.৪.৬ কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ছয় মাস আর সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে আইসিসি। সাকিব আকসুর জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগিতা করায় ১৮ মাস শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে আপাতত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে আইসিসি।

বিসিবির এক কর্মকর্তা বলেন, স্পট ফিক্সিং বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি বা অভিযোগও তোলা হয়নি। আইসিসি পরিস্কার জানিয়েছে, সাকিব জুয়াড়ির কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি জানাননি। এতেই আইন ভাঙা হয়েছে। তবে সাকিব কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আকসু ভালো করেই জানে, সাকিব ক্রিকেটে যে কোনো অনৈতিক বিষয়কে ঘৃণা করেন। তিনি এও বলেন, 'সাকিবের কেসটা মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো নয়। তবে এটা অবশ্যই এ দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় দুঃসংবাদ।'

তিনটি টি-টোয়েন্টি ও দুটি টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ দল কাল সন্ধ্যায় দিল্লির উদ্দেশে দেশ ছাড়বে। সাকিবকে অধিনায়ক করে এরই মধ্যে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দল ঘোষণা করেছে বিসিবি। টেস্টের দল ঘোষণা করতে আরও দু-তিন দিন সময় লাগবে। দেরিটা যে সাকিবের জন্যই, সেটি বোঝাই যাচ্ছে। ব্যক্তিগত কারণে তামিম ইকবাল সিরিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। শোনা যাচ্ছে, সাকিবের যাওয়া না হলে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পেতে পারেন মোসাদ্দেক হোসেন বা লিটন দাস। টেস্ট সিরিজে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেন মুশফিকুর রহিম বা মুমিনুল হক।