x

এইমাত্র

  •  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জানালার গ্রিলে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় একজনের মৃতদেহ উদ্ধার

ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে কোন কোন আওয়াজ বন্ধ করতে চাচ্ছেন?

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৯

আবরার ফাহাদ। ক্রমবর্ধমান তালিকার সর্বশেষ নাম। না, সর্বশেষ হয়ত বলা যাচ্ছে না। কারণ এই তালিকার শেষটা এখনও অনেক দূরে। তিনি বুয়েটের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে প্রতিটি মানুষেরই একটি না একটি মত থাকে, থাকে মতাদর্শ, তার মুখের কথা থেকে শুরু করে পায়ের চলা, সকল কিছুই হয় রাজনৈতিক। সে মতাদর্শ গুলোর উৎসও বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতা ও সম্ভবনা। অবরারেরও একটা মতাদর্শ ছিল। সেই মতাদর্শ কি সেটা এই মুহূর্তের জন্য অগুরুত্বপূর্ণ। সেই মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করেই সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলো যে ভারতের সাথে যে ৭ দফা সমঝোতা চুক্তি হয়েছে সেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী।

একজন মানুষ নানান মতাদর্শ থেকে এই চুক্তির বিরোধিতা করতে পারে। কেউ হয়ত ভারতের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে আমলে নিয়ে এই চুক্তির বিরোধিতা করছে, কেউ জাতিয়তাবাদী চিন্তা থেকে, কেউ বা সাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকে। সেটাও অন্য কোন সময় আলাপের দাবি রাখে। যাই হোক। আবরার তার মস্তিষ্কের চিন্তা ফেসবুকের স্ট্যাটাস আকারে প্রকাশ করে। এবং তারপর তার সাথে এমন ঘটনা ঘটে, যা বাংলাদেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি রাতের নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। তার তলব পরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার নেতৃবৃন্দের রুমে। প্রথমে ২০১১ তারপর ২০০৫ নাম্বার রুমে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তারপর তার ওপর হামলে পরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন এবং হলে থাকেন তাদের কাছে এটি ডাল ভাতই বটে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখনই, যখন “বেয়াদব” “অবাধ্য” ছেলেটি ছাত্রলীগের অনুমতি ছাড়াই মারা যায়। এত বড় সাহস ছেলেটি কোথায় পেল সেটা ভেবে বোধ করি পাঠকরা পুলকিত হবেন। যদি কোন ছাত্রলীগ কর্মী এই লেখাটি পড়ে থাকেন তবে আপনারও ক্ষিপ্ত হবারই কথা। একে তো ছেলেটি ফেসবুকে “সরকার বিরোধী” কথা বার্তা লিখছে, তার শাস্তি স্বরূপ তাকে মারধর করলে আবার সে মরে গেল! মগের মুল্লুক নাকি! গণরুমের এত শিক্ষা, এত ম্যানার, “ভাইরা তোদের মা বাপ”, “ভাইদের পারমিশন ছাড়া বাথরুমেও যাবি না”, এই সকল হিতোপদেশ উপেক্ষা করেই আবরার মারা গেল। অবরারই প্রথম না যদিও। এর আগে ঠিক এইরকম ভাবে মারা গিয়েছিল বুয়েটেরই সাবিকুন্নাহার সনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাফিজুর, আবু বকর, মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান। আগেই বলেছিলাম, তালিকাটা অনেক লম্বা। মরে তো গেল, বিপদে ফেলে দিয়ে গেলো পুরো বাংলাদেশকে। কত কষ্ট করে সম্রাট নাটক সাজিয়ে ভারত-বাংলাদেশ অসম চুক্তি ঢাকা গিয়েছিল, তা আবার সামনে চলে আসলো। তারা হয়ত তাদের মতো করে একভাবে সমাধান খুঁজবেন। পেয়েও যাবেন।

এই যে বর্তমান ব্যবস্থা, এটা যত দিন টিকে আছে, তারা জানে, যে দলই ক্ষমতায় থাক, তারা কিছু সুবিধাভোগী শ্রেণী তৈরি করবে শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য। বেকার সমস্যার এই দেশে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য সাদা পোশাকে লাঠিয়াল বাহিনীর অনেক পদ খালি থাকে। থাকে অনেক সুযোগ সুবিধাও। সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনেক মানুষ। যখন যে বেশি সুবিধা দিবে, তখন সামগ্রিক স্বার্থকে ভুলে তার পেছনে গিয়ে ক্ষুদ্র সাময়িক স্বার্থের লোভে জড়ো হয় অনেক মানুষ। আবার ভাগ বাটোয়ারা না মিললে অনেকে বিরোধী পক্ষেও চলে যায়। অপেক্ষায় থাকে কবে তার সময় আসবে এবং তার কপাল ফিরবে। আবার এই লাঠিয়াল বাহিনীকে তারা সুন্দর নাম দিয়েছেন, “ছাত্র রাজনীতি”। যদিও এতকাল মানুষ জানতো ছাত্র রাজনীতি মানে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৮৪ তে আরো এক দফা শিক্ষা আন্দোলন, ৯০ এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, এগুলো হল ছাত্র রাজনীতি। কিন্তু হায়, এখন মানুষ ছাত্র রাজনীতি বলতে বুঝে খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হল দখল। এগুলোই নাকি “ছাত্র রাজনীতি”। সেই আন্দোলন গুলোর স্লোগান “ধনীর জন্য শিক্ষা নয় সবার জন্য শিক্ষা চাই”, “শিক্ষা কোন পণ্য নয়, শিক্ষা আমার অধিকার” এই স্লোগানে এখনও মিছিল হয়, হয় না যে তা না। কিন্তু সেটা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করার মত শক্তিশালী না। হাল আমলে এইসব স্লোগান প্রাসঙ্গিক হলেও এগুলো এখন ঠিক “চলে না”। কর্পোরেট কোম্পানির দাসত্ব করা, প্রচণ্ড মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে নিজের ক্যারিয়ার গোছানো, কাঠের মালা বানিয়ে বিক্রি করা, মহীনের ঘোড়াগুলি বা চে গেভারার টিশার্ট টুপি পরে এস্থেটিক তরুণ তরুণীদের গ্যাং এ জয়েন করা, সবকিছু থেকে নিজের দায় অস্বীকার করে কুল ড্যুড সেজে থাকা, এইসবই খুব চলে হাল আমলে। এখন তাদেরকে দোষ দিয়ে লাভ কি। এগুলো তো আকাশ থেকে পরে নি। সমাজেই ছিল, তারা বুঝে না বুঝে এর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।

ঠিক এমন সময় অনেকেই দাবি তুলছেন ছাত্র রাজনীতিই বন্ধ করতে। আসলেই খুব সহজ সমাধান। কিন্তু কিছু বিষয় যদি একটু আমলে নেন।

১. ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কি হয়েছে সেটা কারোরই অজানা না। যখন এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত গুন্ডাতন্ত্র কায়েম হয়, তখন ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে ঠিক কোন আওয়াজ কে আপনি বন্ধ করবেন? যেই আওয়াজ জয় বাংলা বলে রড রামদা, চাপাতি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে সেই আওয়াজ বন্ধ করবেন নাকি যেই রাজনীতি সচেতন আওয়াজ “সবার জন্য শিক্ষা চাই”, “শিক্ষা খাতে বাজেট ২৫% বরাদ্দ চাই”, “শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই” স্লোগান দেয় সেই আওয়াজকে বন্ধ করবেন?

২. ছাত্র রাজনীতি কলুষিত করার দায় কার? কারা সন্ত্রাস, হল দখল, ক্ষমতার একচ্ছত্র প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনীতির এই কদর্য রূপ প্রদান করেছে? সকল ছাত্র সংগঠন? এটা সবাই করে? আপনি হয়ত বলবেন “যেই ক্ষমতায় যাবে সেই এটা করবে”, হ্যা, এইখানেই রয়েছে ফাঁক। এইটা একটা সম্পূর্ণ সিস্টেম। যদি এই মাস্তানতন্ত্র বজয়েই থাকে, তাহলে ফেরেশতারাও যদি আসে, সেও এই কাজই করবে। যদি কেউ নাও আসে, অদৃশ্য হাত দিয়ে এই কাজগুলো হবে। কিন্তু এটা বলেই কি আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করবো? যেন তেন ভাবে ক্ষমতার সাথে অথবা ক্ষমতা প্রত্যাশীদের সাথে থাকা তো এখন খুব সহজ। শুধু একটু পা চেটে চলতে পারলেই এখন যে কেউ এই ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে। তারপরও একটু খুঁজে দেখেন, কিছু মানুষ এই সহজ সরল রাস্তা ছেড়ে যেন তেন ভাবেই হোক ক্ষমতায় বসার নীতিকে ছেড়ে বরং এই ব্যবস্থাটাই পাল্টানোর সংগ্রাম করছে, তারা চায় সেই ব্যাবস্থার বদল। তাতে যদি তারা হেরেও যায়, তাদের দুঃখ থাকবে না। কারণ “আমি ক্ষমতায় থাকলে এই করবো সেই করবো” এর চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ “আমি ক্ষমতায় না থাকলেও আমি চাইবো এমন একটা ব্যাবস্থা সেখানে সেই ক্ষমতায় থাক সে যেন জনমানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকে”।

৩. অনেকে আবার সমস্যা খুঁজছেন দলীয় রাজনীতির ভেতরে। দলীয় রাজনীতি না থাকলে মনে হয় এই সমস্যা হত না। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ছাত্রলীগ কিন্তু কোন দলের অঙ্গ সংগঠন নয়। সুতরাং “দলীয় রাজনীতি” তে সমস্যা খোঁজার কোন অবকাশ নেই। রাজনীতিতে দল থাকবে, দলীয় রাজনীতি থাকবে, সেটার সাথে ছাত্র রাজনীতির মিথষ্ক্রিয়াও থাকবে। এই মিথষ্ক্রিয়াকে আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। এই বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামো তে দলীয় রাজনীতির বাইরে কিছু থাকা অসম্ভব। কারণ দিন শেষে আপনার মাথার ওপর শাসন করছে কোন না কোন দল এবং আপনি তার শাসনেরই অন্তর্গত। আপনি যদি কিছু নাও করেন সেটাও একটা দলীয় রাজনীতি। এখানে আপনি যদি বলেন আমি দলীয় রাজনীতি করি না সেটা হবে নিতান্তই আপনার মানুষের সামনে ক্লিন থাকার ভান।

৪. ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি এই নতুন না। চিরকালই ছাত্র রাজনীতির আদর্শিক ও বিপ্লবী ধারা রাষ্ট্রের সকল অত্যাচারের চিরশত্রু ছিল। তাই রাষ্ট্র সবসময়ই চেয়েছে ছাত্র রাজনীতিকে সমুলে উৎপাটন করতে। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে তাকে বারবারই পরাজিত হতে হয়েছে। পতনও ঘটেছে তাদের। এমনই ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস। আমরা আয়ুব খানের কথা জানি, তার পোষা এনএসএফ এর কথা জানি, আমরা এরশাদের কথা জানি, তার পোষা ছাত্র সমাজের কথা জানি। যদিও ইতিহাস চর্চা ও রাজনীতি চর্চা কে নিরুৎসাহিত করায় তাদের কৃতকর্মের সিংহভাগই বর্তমান ছাত্র সমাজের জানার বাইরে। আপাত দৃষ্টিতে এগুলোকে ওই দলের ছাত্র রাজনীতির হাতিয়ার বলে মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে এই সংগঠন গুলো হল ছাত্র রাজনীতির বীজ উপড়ে ফেলার হাতিয়ার, তাকে কলুষিত করে মানুষের সামনে ঘৃণ্য করে তুলে ধরার হাতিয়ার। সর্বশেষ এই হাতিয়ারে নাম লিখিয়েছে ক্ষমতাপ্রত্যাশী ছাত্রদল, ছাত্র শিবির এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ। বর্ণে গন্ধে আলাদা হলেও এই সংগঠনগুলোর লুকানো এজেন্ডা এক। সেই একই তৎপরতা আবারও শুরু হয়েছে। ভোট ডাকাতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজি যাতে বাধাহীন হয়, প্রতিরোধ হীন ভাবে চলতে পারে তাই এই প্রয়াস।

ভাবার সময় হয়েছে, সন্ত্রাসীরা ডাক দিলে প্রতি হল থেকে কেন নিয়ম করে ৫০-৬০ জন বের হয়, আর কেন আপনার ৩০ জন শিক্ষার্থীকে রাস্তায় নামতে একটা লাশের প্রয়োজন পরে। ভাবার সময় এসেছে। সন্ত্রাসীদের পক্ষে ক্যাম্পাসে মিছিল হয়, স্লোগান হয়, অথচ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিছিল ডাক দেবার জন্য মানুষ খুঁজে বেড়াতে হয়। ভাবার সময় এসেছে, কেন আমরা না জেনে না বুঝে হাজার মাইল অতিক্রম করতে পারি কিন্তু কেউ যদি আমাকে বুঝে শুনে দুই কদম এগোতে বলে আমি আর আগাই না।

দিন যাচ্ছে চরম আস্থাহীনতার। কোন কিছুর প্রতিই মানুষের আস্থা নেই। না সে শুভ শক্তি না অশুভ শক্তি। কিন্তু আস্থা অর্জন ছাড়া যে বিকল্প পথ নেই। সেই আস্থা অর্জনের দায়িত্ব কার? বিড়ালের গলায় ঘন্টি বাঁধবে কে? কোন আসমানী ঘন্টি তো এমনি এমনিই বেঁধে যাবে না। ঘন্টি বাঁধতে হবে আমাকে। ঘন্টি বাঁধতে হবে আপনাকে। ঘন্টি বাঁধতে হবে এই দেশের আপামর ছাত্র জনতাকে। ঘন্টি বাধার জন্য ঐক্যবদ্ধ হোন। সংগঠিত হোন। যতক্ষণ না হবেন, এই লাশের মিছিল বাড়তেই থাকবে। বইতে পারবেন না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

লেখকদের নামঃ