x

এইমাত্র

  •  এন্ড্রু কিশোর আর নেই
  •  মহামারি করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ৫ লাখ ৩৬ হাজার, আক্রান্ত ১ কোটি ১৫ লাখেরও বেশি
  •  বড় নিয়োগ আসছে প্রাথমিকে
  •  এবারের হজে কাবা স্পর্শ করা নিষিদ্ধ
  •  ঈদের হাওয়া নেই মসলার বাজারে

‘সহমত ভাই’: একটি গভীর বিকারের লক্ষণ

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৯, ১৭:১৯

সেই ষোড়শ শতকে খ্যাতিমান রাষ্ট্র দার্শনিক ইতিয়েন দ্য লা বোয়েতি তাঁর ‘ডিসকোর্স অন ভল্যান্টারী সার্ভিচিউড’ গ্রন্থে লিখেছেন, “যদি তোমার সুঠাম হাত ব্যবহার করতে না দাও তবে একজন নিপীড়ক কী করে অগণন মানুষকে অত্যাচার করতে সক্ষম হয়? তোমাদের পাগুলো সে ব্যবহার করার সুযোগ যদি না পায় তবে এত বিশাল ভৌগোলিক এলাকায় কী ভাবে সে ত্রাসের আধিপত্য জারি রাখে?” কি অকাট্য যৌক্তিকতা! কি অন্তর্ভেদী জিজ্ঞাসা!

ইতিহাসে এ জিজ্ঞাসাগুলো বার বার উঠে আসে। বিশেষকরে ২১ শতকের বাংলাদেশে প্রশ্নগুলো ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক যখন চারিদিকে ‘সহমত ভাই’ নামে এক নতুন প্রজাতির বিকাশ দৃশ্যমান। এর বর্নাঢ্যতা নজিরবিহীন। এরা যেন মোসাহেবির চতুর্থ প্রজন্ম (ফোর জি)। বিষয়টি যে তামাশা হিসেবে বিবেচনা করে গুরুত্বহীন ভাবা যাবে তা কিন্তু নয়। তলিয়ে দেখা দরকার, এখনকার নাগরিকেরা কেন নির্লজ্জের মত ক্রমাগত ‘সহমত ভাই’ প্রজন্মের অনুসারী হয়ে উঠছেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সদস্যদের কাছ থেকে প্রশ্নাতীত-আনুগত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার বিবেচনা করেন বলে মনে হয়। অথচ, দলের তাবৎ সিদ্ধান্ত সকল সদস্য মেনে নাও নিতে পারেন। সেটিই তো স্বাভাবিক। সেটিই মানবিক। ওদিকে অধিকাংশের ঐকমত্যের কারণে ভিন্নমতপোষণকারী সদস্যবৃন্দ এক ধরণের গণতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। বিচ্ছিন্নতাই শুধু প্রাপ্তি নয় তাঁদের, হারাতেও পারেন তাঁরা নানান রকম রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক সুবিধা ও জৌলুশ।

প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির মতাদর্শিক পৃথিবী নির্মাণ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবখানে যদি ভিন্নমত কার্যত নিরুৎসাহিত হয় তবে যা অবশিষ্ট থাকে তা থেকে জন্ম নেয় ‘সহমত ভাই’। মতাদর্শ-প্রকৌশলী হিসেবে চিহ্নিত এ চার ধরণের প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কর্মকান্ডের দিকে তাকালে উত্তর পাওয়া যাবে নিশ্চয়। বিশেষভাবে বলা দরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা। গত কয়েক দশক ধরে চলমান শিক্ষা-সংস্কৃতি মুক্তিযুদ্ধের মূল তিন চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নির্মাণের সাহস যোগাতে আর সক্ষম থাকছে না।

মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় দুশ বিলিয়ন নিউরণ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা একরকম ‘নিশ্চিত’ করেছেন। এই নিউরণ-সমুদ্রের যে অংশগুলো শিশুর সামাজিকায়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উদ্দীপ্ত করা হবে, শিশুটি প্রকৃত প্রস্তাবে সে দিকেই বুদ্ধি নির্মাণের ঝোঁক তৈরি করতে সামর্থ অর্জন করবে। অথচ, আজ পর্যন্ত কিন্ডার গার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও কি বৃহত্তর অর্থে ভিন্নমত অনুশীলনের পরিসর সৃষ্টি করা গেল? যায়নি। তা যেমন শিক্ষকবৃন্দের পরস্পরের মাঝে, তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে। প্রায়শই আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো যেন এক একটি সামন্ত-রাজের দরবার কক্ষে পরিণত হয়। সেখানকার সামগ্রিক আবহ শিক্ষার্থীদের তটস্থ না করে পারে না। প্রচলিত ব্যাংকিং শিক্ষা (ছাত্রী-ছাত্রদের মস্তিষ্কে জমা রাখার লেকচারভিত্তিক ও মুখস্তনির্ভর) পদ্ধতিতে শিক্ষক কর্তৃক উপস্থাপিত ‘জ্ঞানের’ প্রতি শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা, ভিন্ন মত দেয়া বা অপ্রচলিত পথে বিশ্লেষণ করবার সুযোগ কতখানি পাওয়া যায় তা শিক্ষার্থী মাত্রই জানেন।

অথচ, ভিন্নমত ভিন্ন গণতন্ত্র তো আধিপত্যবাদ আর ‘নির্বাচনের’ মিশেলে এক দোআশলা রাজনৈতিক ব্যবস্থাই তৈরি করে যেখানে প্রথমটাই প্রবল রূপে হাজির হয়। এক সময়কার ঔপনিবেশিত (যদি নয়া উপনিবেশ নাও থাকে) আমাদের রাষ্ট্রসমূহ তো এই দোআশলা ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে না। গণতন্ত্রের আকাংক্ষায় বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাহসহ ত্রিশ লাখ দেশপ্রেমিক মানুষ জীবন দিয়েছেন। সম্ভ্রম হারিয়েছেন চার লাখেরও বেশি নারী মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ঐ গণতন্ত্রেরই জন্য। আইনের শাসন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন, সকল নাগরিকের সমান অধিকার, সম্পদ ও ক্ষমতায় সমতাভিত্তিক অংশগ্রহণ, আধিপত্যবাদের অনুপস্থিতি, সমালোচনার অধিকার ইত্যাদিই তো আসল গণতন্ত্রের মূল উপকরণ। অন্যভাবে বললে, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারই হলো গণতন্ত্রের বুনিয়াদ। অথচ, স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পরে এসেও সেই গণতন্ত্রের পথ চেয়ে দাওয়ায় নিথর বসে আছেন অগুনতি পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক আপামর মানুষ।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে একটি নয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। এরা বৈষয়িক অর্জনের জন্য বেপরোয়া। এ মধ্যবিত্ত প্রধানত চাটুকারীতা আর তোষামোদে তুলনাহীন। কারণ তারা দেখছে, দেশে আইনের শাসন নেই। সাংবিধানিক প্রতিষ্টানগুলো ‘গণতান্ত্রিক’ হয়ে উঠতে পারেনা। ফলশ্রুতিতে, প্রায় সমস্ত পেশাজীবী ক্ষমতার উপাসনালয়ে ক্রমাগত পুষ্পাঞ্জলি দিতে শুরু করেন। অনেকে আবার কাঠামোগতভাবে বাধ্যও হন। সন্তানেরা, তরুণেরা দেখে- তাদের অনুস্মরণীয় বয়জ্যেষ্ঠ্যরা, এমন কি শিক্ষকরা প্রশ্নাতীত ‘সহমত ভাই’ হয়ে যাচ্ছেন দিনে দিনে। অনেকে তাই এখন ‘সহমত ভাই’ স্লোগান তুলে ক্ষমতা, ভোগবাদ আর সম্পদের বেদিতে চিন্তাহীন আনুগত্য সমর্পণ করছেন। একি তারুণ্যের নিছক নীচতা নাকি সমাজ ও সংস্কৃতির সামগ্রিক পরাজয়?

পরাজয় বলছি, কারণ দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বটে- কিন্তু সমাজটা তো উদার, মানবিক আর গণতান্ত্রিক হতে পারেনি। গণতন্ত্রের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো ভিন্ন মতের অনুশীলন। সেই প্রাচীন দার্শনিক শিক্ষাগুরু সক্রেটিস থেকে শুরু করে অমর্ত্য সেন পর্যন্ত আমরা দেখেছি যে, যৌক্তিক ও মানবিকভাবে ভিন্নমত চর্চার মধ্য দিয়ে একটি সমাজ প্রগতির পথ ধরে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে পারে। সমাজে সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী মুল্যবোধ বিকশিত হয়। ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসীবাদী উপকরণগুলো হয় দুর্বল । তা না হলে আজকে যে নিপীড়িত কাল সে বা তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম নিদারুণ নিপীড়ক হয়ে ওঠে। নিপীড়িতরা নিদেনপক্ষে প্রতিক্রিয়াশীলতার বুকে আশ্রয় নিয়ে মুক্তি খুঁজে ফেরে। বলা দরকার, অমিমাংসিত ইতিহাস কখনোই চিরতরে চলে যায় না। সে ফিরে ফিরে আসে।

নেতৃবৃন্দ যতই বলছেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূণ্য সহনশীলতা, পাল্লা দিয়ে ততই বাড়ছে লুণ্ঠন দুর্নীতি ধর্ষণ। বেইনসাফের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে মানুষ ক্রমাগত নির্লজ্জ হয়ে উঠছে। পরিচয় প্রকাশিত হবার পরও একজন অপরাধী সামাজিক পরিসরে বিচলিত হচ্ছেন না। বরং অন্যায়কারীর পক্ষে রাজপথে নামছে বেহায়া মিছিল! সাধারণ মানুষ আজ বাকরুদ্ধ। অনাচারে অবাক হয়ে যতটা, নিপীড়িত হয়ে তার চেয়ে ঢের বেশি । নিরীহ মানুষ তো মহাকাশে গিয়ে ওস্তাদী দেখাতে চায় না। তারা চায় মানুষের মর্যাদা নিয়ে জীবনের উৎসবে যুক্ত হতে।

তাই বলতে চাই, পুকুরের সবটুকু জল বিষাক্ত হলে বোয়াল, মাগুর বা মলা কোন মাছই ভালো থাকতে পারে না। হয়ত ছোট মাছটা আগে মরে। পালা কিন্তু সবারই আসে একদিন। প্রায় সকলে ‘সহমত ভাই’ প্রজন্মে নাম লেখালে সমাজের বৃহত্তর রুগ্নতা, অন্যায্যতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। তাই ‘সহমত ভাই’ রোগের সমাধান হিসেবে আবার ইতিয়েন দ্য লা বোয়েতি’র কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেন, যদি শীতল জল দিয়ে নিপীড়ণের আগুন নেভাতে না পারো, তবে সেই দানবীয় অগ্নিশিখায় অতিরিক্ত শুষ্ক জালানী সঞ্চালন করা থেকে বিরত থাকো। এটি ন্যূনতম প্রতিরোধ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রথম প্রকাশ: বার্তা২৪.কম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

লেখকদের নামঃ