x

এইমাত্র

  •  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জানালার গ্রিলে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় একজনের মৃতদেহ উদ্ধার

একটি 'জোকার' কথন

একজন মানসিক অসুস্থতায় ভোগা আর্থার ফ্লেকের গল্প

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৪৫

নিয়াজ মোর্শেদ রেজা

মানুষটি আর দশজন মানুষের মত নন। যার রয়েছে একটা ভয়াবহ শৈশব এবং দৈন্যতায় ভরা যৌবন কিংবা ব্যর্থতায় ভরা কর্মজীবন। তীব্র মানসিক অসুস্থতায় ভোগা আর্থারের জীবনটা যেন এক রম্য গল্প, যেখানে তিনি হন সবার জীবনে একটি ক্ষুদ্র হাসির পরিচ্ছেদ৷ আশেপাশের পরিচিত মানুষের জীবনের ভেনচিত্রে আর্থারের জীবন-বৃত্তের পুরোটা জুড়েই রয়েছে তাচ্ছিল্য, অবহেলা কিংবা নির্যাতনের রক্তিম তুলির আঁচড়। 

আপনি যখন রুপালী পর্দায় কিংবা মোবাইল ল্যাপটপের পর্দায় এই মানুষটির জীবনের গল্প জানতে থাকবেন, আপনি কখনও সমবেদনা বোধ করবেন, কখনও আনন্দিত হবেন, কখনও ঘৃণা করবেন এবং কিছু সময়ে ভৌতিক গল্পের ক্লাইম্যাক্সের মতোন ভীতও হবে। এবং যখন প্রথমবার দেখা শুরু করে উঠবেন, আপনার মনে একটা ঘোর লেগে থাকবে যে ঘোর আপনাকে অনেকটা সময় মোহাবিষ্ট করে রাখবে৷ মুভির সিনেমাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিংবা আর্থার ফ্লেকের হাসি দুঃস্বপ্নের মতোন তাড়া করে বেড়াবে বাস্তব জীবনের কর্মব্যস্ততার মাঝেও৷ একই হাসি মুভির কখনও আপনাকে হাসাবে, কখনও নিস্তব্ধ করে দিবে কিংবা কখনও মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিবে৷ 

প্রচলিত কমিক বইয়ের আদলে তৈরী হওয়া চলচ্চিত্রের মতো ভরপুর বিনোদন এবং একশন কোনটাই নেই এখানে৷ তবুও আপনি এক সেকেন্ডের জন্যে রেস্টিং স্পেস পাবেন না৷চোখের পলকেই যেন দু'টো ঘণ্টা কেটে যাবে৷ ওয়াকিন ফিনিক্সের অভিনয়টা হিথ লেজারের অভিনয় ছাড়িয়ে গিয়েছে কি না এটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না৷ কেননা, দুইটা চরিত্র দুইটি ভিন্ন কনটেক্সটে চিত্রায়িত৷ একজন মেথড এক্টর বা জাত অভিনেতা হিসেবে ওয়াকিন ফিনিক্সের সফলতা এখানেই৷ কেননা, হিথ লেজারের সর্বগ্রাসী অভিনয় যা কিনা সর্বকালের সেরা অভিনয়ের একটি ধরা হয়, সেই চরিত্রকে হুবুহু অনুসরণ না করে নিপুণ স্বকীয়তায় নিজের মত করে ফুটিয়ে তুলতে পারা কোন ছেলেখেলা নয়৷ অনেকের মতে তো এটি হিথ লেজারের অভিনয়কে ছাপিয়ে গেছে৷ আরও কয়েকবার দেখার পর হয়তো প্রকৃত তুলনাটা করা যাবে৷ বর্তমানে একরাশ মুগ্ধতা আর দুই ঘন্টার থ্রিলিং রোলার কোষ্টারের ধকলটাই মাথা থেকে সরাতে পারছি না৷ 

টড ফিলিপ্সের ডিরেকশন, লরেন্স শেরের সিনেমাটোগ্রাফি, ফিনিস্কের অভিনয় কিংবা Hildur Guðnadóttir এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, এদের পার্ফমেন্সে কোনটাতেই দশের মধ্যে নয় দেবার সুযোগ নেই৷ এতোটা নিখুঁত ছবি বর্তমান সময়ে শেষ কোনবার দেখেছি স্মরণে আসছে না৷ হাউসফুল সিনেমা হলে সিনেমার বিভিন্ন ক্লাইম্যাক্সের সময়গুলোতে এতোটাই পিনপতন নীরবতা ছিল যে পুরো সিনেমা হলটাকেই গোরস্থানের মত থমথমে মনে হবে৷ যারা সিনেমাটি দেখেন নি, তাদের কাছে হয়তো কথাগুলো অনেক বেশী অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখা শেষে আপনাকেও একমত হতে হবে দ্ব্যর্থহীনভাবে৷ 

ব্যক্তিগতভাবে শুধু একটাই কমতি চোখে লেগেছে, যা হয়তো অনেকের চোখে তেমন কোন কমতি নাও মনে হতে পারে৷ সেটি হলো মুভিতে ডার্ক নাইটের মতো ভুরি ভুরি শক্তিশালী পাঞ্চলাইন সমৃদ্ধ ডায়ালগ ছিল না। হয়তো কাল্ট হিস্টোরী হিসেবে ওয়ালপেপার বা কোট করবার মত অজস্র ডায়ালগ নেই, কিন্তু যে কয়টিই মেনশন করবার মত ডায়ালগ রয়েছে সেগুলোও নেহাত কম নয়৷ বছরের শেষার্ধে যদি না ফিনিক্সের অভিনয়কে ছাপিয়ে যাবার মত কোন অভিনয় না দেখতে পাওয়া যায়, তবে ফিনিক্স সামনের বছর অস্কারে আত্মবিশ্বাসের সাথেই ব্যাকস্টেজে গিয়ে হোস্টকে বলতেই পারেন তার এই মুভিরই ডায়ালগ, "When you bring me out as a winner of leading actor of this year's oscar, can you introduce me as a joker?" 

অনেক সমালোচক ও চিন্তাবিদেরা অবশ্য মুভিটার আফটারম্যাথ ও জনমনে প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনেক বেশী চিন্তিত৷ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে সিনেমা হলের বাইরে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারণ, মুভিটা অনেক বেশী থট প্রোভোকিং৷ আর্থারের মত ভালনেরাবল মানসিক অশান্তিতে ভোগা মানুষগুলো হয়তো নিজের জীবনের ব্যর্থতা বা মানসিক অসুস্থতাকে বিদ্রোহ এবং সংঘাতে পরিণত করতে পারে, এই ধারণাটাই হয়তো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এতোটা ভাবিয়ে তুলেছে৷ কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমিও সিনেমার পরিচালকের সাথে একমত এই বিষয়ে যে, সিনেমা হচ্ছে একটা আর্ট৷ বাস্তবতার চিত্রায়ন সবসময়ই যে পজিটিভ ভাইব ছড়াবে, এটা ভাবার কোন কারণ নেই৷ আর এর দায়ভারও ও চলচ্চিত্র নিতে পারে না৷ 

সবমিলিয়ে "জোকার" একটি মাস্টারপিস মুভি৷ তবে এই মুভি সব শ্রেণীর দর্শকের জন্যে নয় এটাও সত্য, এবং শিশুদের জন্যে তো মোটেই নয়, কারণ এটি আর দশটি কমিক বুক সিনেমার মতোন এন্টারটেইনিং এলিমেন্টসে ভরপুর নয়৷ বরঞ্চ মুভিতে যেসব ডিস্টার্বিং ম্যাটারিয়াল আছে তা সবাই হয়তো সঠিকভাবে নিতে নাও পারে৷ 

আর সবশেষে টড ফিলিপ্স ও ওয়াকিন ফিনিক্সকে এক আকাশ সমান ভালোবাসা ও ধন্যবাদ৷ ডিসির বর্তমান মুভির প্রেক্ষিতে, নোলানের ট্রিওলজির পরে এবং হিথ লেজারের অভিনয়ের পরেও যে এইভাবে জোকারকে উপস্থাপন করা সম্ভব তা দেখানোর জন্যে টুপি খোলা সালাম৷

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত