x

এইমাত্র

  •  করোনা সঙ্কটে কর্মস্থলে অনুপস্থিত:ফেঁসে যাচ্ছেন ১১ কর্মকর্তা
  •  করোনা: বাংলাদেশে শুধু বয়স্ক নয়, ঝুঁকিতে সব বয়সীরাই
  •  বিএসএমএমইউ’র অধ্যাপক ও মেয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত
  •  লকডাউনের মধ্যে বিয়ে করে বরখাস্ত হলেন সরকারি কর্মকর্তা
  •  মসজিদে পাঁচের অধিক মুসল্লি, লক্ষ্মীপুরে ইমাম আটক

সালমান এখনো তরুণ আছেন

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৫৯

বাংলা চলচ্চিত্রের বরপুত্র সালমান শাহ’র চলচ্চিত্রে অভিষেকটা হয়েছিল রাজসিকভাবেই। তার আবির্ভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চয় করেছিল। হলবিমুখ দর্শকদের নতুন করে হলমুখী করিয়েছিলেন তিনি। তার কারণেই ছবির প্রযোজকেরা আবারও নতুন করে ছবিতে লগ্নি করতে শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকে স্বপ্নের নায়ক হয়েই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন সালমান।

১৯৭১ এর সেই রক্তক্ষয়ী সময়ে জন্ম নেয়া সালমান, শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন পরিবার ও বন্ধুমহলে। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটকের মধ্য দিয়ে অভিনয় যাত্রা শুরু করেন ইমন। সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে শুরু হয় চলচ্চিত্র জীবন। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ মুক্তি পায় সালমানের এই চলচ্চিত্র। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ক্যারিয়ারে একের পর এক যোগ হতে থাকে সাফল্যের পালক। এ যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রথম ছবি থেকে শুরু করে শেষ ছবিটি পর্যন্ত সমানতালে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিলেন সালমান শাহ। বাংলা চলচ্চিত্রের সাফল্যের রাজপুত্র হিসেবেও সালমানকে অভিহিত করা হয়। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে গড়েন এক অনন্য মাইলফলক।

টেলিভিশনে নিয়মিত বিরতিতে অভিনয় করলেও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুপ্ত বাসনা পূরণ হতে সময় গড়ায় প্রায় ৮ বছর। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তখন তার চলচ্চিত্রের জন্য নতুন তরুণ মুখ খুঁজছেন। তখন চিত্রনায়ক আলমগীরের স্ত্রী খোশনূর আলমগীরের কাছ থেকে একটি ছেলের ছবি হাতে পান তিনি। যোগাযোগ করতে ফোন করেন ওই তরুনের বাসায়। ফোনে উত্তর আসে, “ছোট সাহেব তো রাতে বাসায় কখনো ফেরে, কখনো ফেরে না! এমনিই রাত তিন-চারটা বাজে।” তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই ছেলেকে দিয়ে তার কাজ হবে না। পরদিন তিনি ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্টে অন্য একজন তরুণকে দেখতে যান। কিন্তু সেই ছেলেটিকে সোহানুর রহমান সোহানের পছন্দ হয়নি। তখন তিনি ওই রেস্টুরেন্টের টেলিফোন থেকেই গতকালের সেই তরুণের বাসায় ফোন করেন। এবার সেই তরুণ নিজেই ফোন ধরেন, নাম ইমন। তিনি দেখা করতে চান ইমনের সাথে। ওই রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিলে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট সময় চান ইমন। ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে করতে ওই রেস্টুরেন্টের সিসিটিভির স্ক্রিনে সোহান দেখছিলেন একজন তরুন এদিক সেদিক কাউকে খুঁজতে খুঁজতে ভেতরে ঢুকছে। তখনই তিনি সেখানে উপস্থিত নৃত্য পরিচালক আবুল হোসেন বাবুকে বলেন, “বাবু ভাই, আমি আমার হিরো পেয়ে গেছি।” তারপর রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলে সেই তরুণকে ডাকেন সোহান। জানলেন, এই তরুণকেই তিনি ফোন করে আসতে বলেছিলেন। এরপর সোহান ছবির কথা বললে ছবির ব্যাপারে ইমন আগ্রহ জানায়। সোহান তখন ইমনের বাবা-মা’র সঙ্গে কথা বলতে চান। তারপর তিনি ইমনকে নিয়ে বাসায় গিয়ে তার মায়ের সাথে কথা বলেন। ইমনের মা সোহানকে বলেন, “ঠিক আছে বাবা, আমার ছেলেকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। এখন তুমি ওকে মানুষ করো। কী কী করতে হবে, সেই দায়িত্ব তোমার।”

সালমান শাহ নামকরণের পেছনেও রয়েছে এই পরিচালকের ভূমিকা। তিনিই প্রথম তাকে ‘সালমান শাহ’ নামকরণ করেন। এক সাক্ষাৎকারে সোহানুর রহমান সোহান বলেন, “চলচ্চিত্রের জন্য নাম একটা বিরাট ব্যাপার। তখন আমি তার নাম শাহরিয়ার থেকে শাহ নিলাম, তার সাথে সালমান যোগ করলাম। তখন আসলে সালমান খান বোম্বের হিরো। তার একটা প্রভাব আমার মধ্যে কাজ করেছে। সেই সালমানের সঙ্গে শাহ দিয়েই ‘সালমান শাহ’ নামকরণ করি।”

এরপর ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ থেকে শুরু করে একে একে ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দিয়ে হয়ে ওঠেন ইন্ডাস্ট্রির মধ্যমণি। তখনকার প্রায় সব খ্যাতিমান পরিচালকদের ছবির প্রথম পছন্দ ছিলেন সালমান। এর পেছনে ছিল তার দুরন্ত পরিশ্রম, মেধা, চলচ্চিত্রের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও সাবলীল অভিনয়। এই অভিনয় দিয়েই অল্প সময়ের মধ্যে তৈরী হয় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা।

সালমান শাহের প্রথম চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এর সাফল্যের পর পরিচালক জহিরুল হক তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। ১৯৯৪ সালের ২২ মে মুক্তি পায় জহিরুল হক ও তমিজউদ্দিন রিজভী পরিচালিত এই ছবি ‘তুমি আমার’। এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মত জুটি বাঁধেন সালমান-শাবনূর। এই ছবিটিও পায় সফলতার তকমা। পরে তার সাথে জুটি বেধে একে একে সুজন সখি (১৯৯৪), বিক্ষোভ (১৯৯৪), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৪), মহামিলন (১৯৯৫), বিচার হবে (১৯৯৬), তোমাকে চাই (১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬), জীবন সংসার (১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), বুকের ভিতর আগুন (১৯৯৭) সহ মোট ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। যাদের প্রায় সবকটি ছবিই ব্যবসাসফল হয়।

চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরুর আগেই সালমান শাহ কিছু নাটক এবং বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছিলেন। জানা যায়, আশির দশকের শেষ ভাগে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় ‘কথার কথা’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। এরই কোন একটি পর্বে হানিফ সংকেতের গাওয়া গানের মিউজিক ভিডিওতে সালমান শাহ মডেল হিসেবে অভিনয় করেন। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ পারিবারিক ঝামেলার কারনে কিভাবে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায় সে গল্প ফুটে উঠেছিল মিউজিক ভিডিওতে। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয় হলেও অনিয়মিত হওয়ার কারণে দর্শক ধীরে ধীরে তাকে ভুলে যায়।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বেশ কিছু টিভি নাটকে ও বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করেন সালমান শাহ। তার অভিনীত একক নাটকগুলো হল: আকাশ ছোঁয়া, দোয়েল, সব পাখি ঘরে ফেরে, সৈকতে সারস, নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী এবং ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে রয়েছে পাথর সময় এবং ইতিকথা। মিল্ক ভিটা, জাগুরার কেডস, গোল্ড স্টার টি, কোকাকোলা, ফানটা – এ সকল বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে অভিনয় করেন তিনি।

সময় কিংবা ছবির সংখ্যায় নয়, স্বনামে এবং সুনামে তিনি আজও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন। তার প্রতিটি ছবিই আজও উপভোগ্য, স্মৃতিকাতর। স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেছেন মোট ৮ জন নায়িকার সঙ্গে। সালমানের সঙ্গে রূপালী পর্দায় দেখা যায় মৌসুমী, শাবনূর, বৃষ্টি, শিল্পী, কাঞ্চি, লিমা, শাবনাজ, শাহনাজ।

অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে প্রয়াত সালমান খ্যাতিমান ও গুণী পরিচালকদের ছবিতে কাজ করেছিলেন। সোহানুর রহমান সোহান এর কেয়ামত থেকে কেয়ামত দিয়ে শুরু করেও পরবর্তীতে শিবলি সাদিক এর ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘মায়ের অধিকার’ এ কাজ করেন সালমান। জহিরুল হক এর ‘তুমি আমার’ ও ‘সুজন সখী’তে কাজ করেন।  গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর ‘স্নেহ’, শফি বিক্রমপুরির ‘দেনমোহর’, দিলিপ সোম এর ‘মহামিলন’, এম এম সরকার ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ ও ‘প্রেম পিয়াসি’, বাদল খন্দকার ( স্বপ্নের পৃথিবী), হাফিজউদ্দিন ( আঞ্জুমান), দেলোয়ার জাহান ঝনটু ‘কন্যাদান’, মালেক আফসারির ‘এই ঘর এই সংসার’, এম এ খালেক এর ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, জীবন রহমান এর প্রেমযুদ্ধ’, মোহাম্মদ হান্নান এর ‘বিক্ষোভ’, মোহাম্মদ হোসেন এর ‘প্রিয়জন’, মতিন রহমান ‘তোমাকে চাই’, শাহ আলম কিরন এর ‘বিচার হবে’, জাকির হোসেন রাজুর ‘জীবন সংসার’, তমিজ উদ্দিন রিজভীর ‘আশা ভালোবাসা’।

বাংলা চলচ্চিত্রের উন্মুক্ত আকাশে যখন ধ্রুপদী পায়রা হয়ে ডানা ঝাপটাচ্ছিলেন সালমান, ঠিক তখনই নেমে আসে অমানিশার ঘোর আধার। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল শুক্রবার। সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীকে টেলিফোন করে বলা হলো তার ছেলের বাসায় যেতে। টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলে সালমান শাহ’র বাসার দিকে রওনা হয়েছিলেন। তবে সালমানের ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে ছেলের মৃতদেহ দেখতে পান নীলা চৌধুরী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো দেশ। তার মৃত্যুর সংবাদ দর্শকদের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে ২২ বছর পরেও অনেকে প্রিয় নায়ককে ভুলতে পারেনি। তার মৃত্যু নিয়ে সেই ঘোর আজও কাটেনি।

সেই সিসিটিভির ইমন থেকে সালমান হয়ে উঠলেন বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক ভরসার নাম। স্বপ্নের নায়ক হয়েই বেঁচে আছেন এদেশের লাখো তরুণ তরুণীর হৃদয়ে। সালমান শাহ্‌ যুগের তরুণেরা হয়ত এখন বৃদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু সালমান এখনো তরুণ আছেন, আজীবন তরুণই থাকবেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত