x

এইমাত্র

  •  করোনা সঙ্কটে কর্মস্থলে অনুপস্থিত:ফেঁসে যাচ্ছেন ১১ কর্মকর্তা
  •  করোনা: বাংলাদেশে শুধু বয়স্ক নয়, ঝুঁকিতে সব বয়সীরাই
  •  বিএসএমএমইউ’র অধ্যাপক ও মেয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত
  •  লকডাউনের মধ্যে বিয়ে করে বরখাস্ত হলেন সরকারি কর্মকর্তা
  •  মসজিদে পাঁচের অধিক মুসল্লি, লক্ষ্মীপুরে ইমাম আটক

ঘাটতি কমাতে দাম বাড়বে বিদ্যুৎ-গ্যাসের

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০৪

সাহস ডেস্ক

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকলেও কেন্দ্র ভাড়া ঠিকই দিতে হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এই লোকসান সামাল দিতে গিয়ে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকেই বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

গত বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শুধু কেন্দ্রের ভাড়া হিসেবেই সরকার দিয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছর এর পরিমাণ হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে বছরে সরকারের খরচ হয় ১৯ হাজার কোটি টাকা।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শেষ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে শিগগিরই। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভা গত সোমবার জ্বালানির দাম বছরে একাধিকবার পরিবর্তন করা যাবে, এমন বিধান রেখে বিইআরসি (সংশোধন) আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে।

বিইআরসির বিদ্যমান আইনে এক অর্থবছরে একবারের বেশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানো যায় না। আইনটি সংশোধিত হলে বছরে একাধিকবার দাম বাড়াতে পারবে বিইআরসি।

২০০৩ সালে পাস হওয়া বিইআরসি আইন ২০০৫ ও ২০১০ সালেও সংশোধন করা হয়েছিল। তবে সেই সংশোধনে বড় পরিবর্তন হয়নি। বিইআরসি আইনের মূল্যবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে, ‘কমিশনের নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাইবে না, যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনো রূপ পরিবর্তন ঘটে।’ এবার এটি সংশোধন এনে বলা হয়েছে, ‘কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে কমিশনের একক বা পৃথক পৃথক আদেশ দ্বারা, প্রয়োজন অনুসারে এক বা একাধিকবার পরিবর্তন করতে পারবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি ও কয়লা আমদানি শুরু করেছে। আগে থেকে তেল আমদানি তো করতই। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ব্যয় বেড়েছে। সেই ব্যয় মেটাতে গিয়ে দফায় দফায় বাড়াতে হবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। সে কারণেই আইনে সংশোধন আনা হচ্ছে।’

তবে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন, বিদেশি কোম্পানি ও এলএনজি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে সরকার স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছে না। নিজেদের গ্যাস পেলে তো দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, ‘স্থলভাগে এখনো যে গ্যাস রয়েছে, তার একটি অংশ আমরা আবিষ্কার করে উত্তোলন করছি। বড় অংশের সন্ধান এখনো আমরা করিনি। প্রয়োজন গোটা বাংলাদেশে কূপ খনন করে গ্যাসের অনুসন্ধান করতে হবে।’

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। পরিস্থিতি এক বছরের মধ্যেও পরিবর্তন হয়। সে কারণে আইনটি যুগোপযোগী করার জন্যই সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার যা কিছু করুক, মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করেই করবে।’

গত ১০ বছরে খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ছয়বার। আর পাইকারি পর্যায়ে বেড়েছে চারবার। এর মধ্যে ২০১৭ সালে এক বছরের মধ্যে দুবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) উচ্চ আদালতে একটি রিট করে। আদালত বিইআরসির কাছে জানতে চান, বছরে দুবার দাম বাড়ানোর কথা আইনের কোথায় আছে। বিইআরসি তখন এর ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘বিইআরসি আইনের পরিবর্তন জনগণের সঙ্গে তামাশার মতো। সরকার অব্যবস্থাপনা রোধ করতে পারলে গ্যাস খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা ও বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমাতে পারে। তাহলে আর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার পড়ে না।’

শুধু ভাড়া সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ব্যয় বেশি বলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বন্ধ থাকলেও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) দিতে গিয়ে লোকসানে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। গত বছরে এই ভাড়ার পরিমাণ ছিল সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ বছর তা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা।

তেলচালিত কেন্দ্রের কারণে পিডিবির লোকসান বেড়েছে। সরকার বিভিন্ন সময় লোকসান সামাল দিতে বিপুল আকারে ভর্তুকি দিয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা ও গত অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ৭ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো না হলে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা।

শীত-গ্রীষ্ম মিলিয়ে সারা বছর দৈনিক উৎপাদন ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। তবে গ্রীষ্মের কয়েক মাসে এই উৎপাদন ১২ থেকে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত হয়। দেশে এখন ২০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

দেশে আগামী ৩০ বছরে কত মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে তার হিসাব করে ২০১০ সালে বিদ্যুতের বিস্তারিত পরিকল্পনা বা পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। এ আলোকে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ হাত দেয়। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হুট করে ২ হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও প্রয়োজন না থাকায় এসব কেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ নিচ্ছে না। এগুলোকে বসিয়ে রেখে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভাড়া দিয়েছে সরকার।

বিইআরসির কাছে গণশুনানিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে পিডিবি বলেছে, ২০২০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৭ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।

বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে পিডিবি শুধু কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, গত বছর দিয়েছে ১৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। চলতি বছর দিতে হবে ২০ হাজার ৩১ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞ ও পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি পেমেন্টের একটি বড় অংশ যাচ্ছে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে। অর্থাৎ কেন্দ্র সারা বছর বন্ধ থাকছে। কিন্তু এ সময় কেন্দ্রগুলো ভাড়া নিয়ে যাচ্ছে। ১০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বছরে ১৭০ থেকে ১৭৫ কোটি টাকা দিয়ে থাকে পিডিবি।

অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রের মাশুল গুনছে পিডিবি
বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় ২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং তেলভিত্তিক কেন্দ্রের গড় ব্যয় ২০ টাকা ৪১ পয়সা। আর শুধু ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটপ্রতি ব্যয় ২৭ টাকা ২১ পয়সা।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিট ২ টাকা ৬১ পয়সা। বর্তমানে ৬ টাকা ২৫ পয়সা। প্রায় এক দশকে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ।

এপিআর এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের এক ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় পড়েছে ৭৪৪ টাকা ৩৯ পয়সা। ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত ৫৬৮ কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন করেছে খুবই সামান্য।

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে কেন্দ্র ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে দাউদকান্দির বাংলা ট্রাকের ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি। এ কেন্দ্রের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় পড়েছে ২৪০ টাকা ৭১ পয়সা। গত ১৫ মাসে ২০০ মেগাওয়াটের জন্য (মে ২০১৮ থেকে জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত) কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে পিডিবি ৪৩৪ কোটি টাকা।

সারা বছর বন্ধ থাকার পরও এগ্রিকো বাংলাদেশ এনার্জি সলিউশন লিমিটেডকে পিডিবি গত এক বছরে ১০০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্রে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদনে এসেছে প্যারামাউন্ট বিট্রাক এনার্জি সলিউশনের ২০০ মেগাওয়াট তেলভিত্তিক কেন্দ্রটি। গত জুলাই পর্যন্ত ডিজেলভিত্তিক এ কেন্দ্র কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও ১৭০ কোটি টাকার বেশি পেয়েছে কেন্দ্র ভাড়া।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ জ্বালানি সহকারী ম. তামিম বলেছেন, ‘সরকার বিদ্যুতের যে চাহিদার পূর্বাভাস ঠিক করেছিল, বাস্তবে তা ঠিক ছিল না। সরকার ভেবেছিল শিল্পে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমান বিদ্যুতের দাম বেশি ও নিরবচ্ছিন্ন নয়। অন্যদিকে শিল্পকারখানায় নিজেদের জেনারেটর দিয়ে গ্যাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে অনেক কম খরচ হয়, তাহলে কেন তারা সরকারি বিদ্যুৎ নেবে? এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর এই অব্যবস্থাপনা চাপিয়ে দেওয়ার মানে নেই।’

তামিম আরো বলেন, ‘২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যেসব রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন ও পাঁচ বছরের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সরকার আবার মেয়াদ বাড়িয়েছে। এসব কেন্দ্রের মেয়াদ এখনই বাতিল করতে হবে। পিডিবির বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন ও দাম কমানো গেলে শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়বে। এতে অব্যবহৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়লে সরকারের লোকসান কমে যাবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত