x

এইমাত্র

  •  গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় নতুন সংক্রমিত ২৬৬৬ জন, মৃত ৪৭ জন
  •  সাহেদ-সাবরিনার ব্যাংক হিসাব জব্দ
  •  মহামারি করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ৫ লাখ ৬৭ হাজার, আক্রান্ত ১ কোটি ২৮ লাখেরও বেশি
  •  ১০ নদীর ১৫ পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপরে
  •  রায়হান কবিরের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করেছে মালয়েশিয়া

লোককবি অসীম সরকারঃ গানে-ভজনে

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:৩৫

'গান চুরি' অর্থাৎ একজনের গান আরেককজনের বলে চালিয়ে দেয়া অন্যায়। এই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন নিশিকান্ত বৈরাগী নামক এক ভদ্রলোক। গানটি ছিল এমনঃ

'আমার কুড়ানো বকুল, লাগলো না তো তোমার পুজায়
আমার তোলা ফুল, আমার কুড়ানো বকুল
আসি বলে বাজাও বাশি, বাসি হলো ফুল'

ইউটিউবে সার্চ দিলে দেখবেন এই গানটি বিজয়গীতি হিসেবে অনেক শিল্পী গেয়ে চলেছেন। সর্বমান্য বিজয় সরকার এই গান লিখেন নাই। এই গানের লেখক অসীম কুমার বিশ্বাস যিনি নিজেও বিজয় সরকারের গান গেয়ে দক্ষিনাঞ্চলে যথেষ্ট জনপ্রিয়। অসীম সরকারকে নিসিকান্ত বৈরাগীর এই চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, 'সে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছে, কি আর বলবো!'

অসীম বিশ্বাসেরা সাধক মানুষ, গানের মানুষ, প্রেমের মানুষ! উনারা ক্ষমা করে দেন আমাদের। আমরা উনাদের প্রান্তিক মানব হিসেবে, ব্রাত্যজন হিসেবে রেখে দেই সাধারনের আলোচনার বাইরে। এ আমাদের অপরাধ, এ আমাদের কৃত অন্যায় তাঁদের প্রতি। একটু হলেও খানিক আলো পড়া দরকার আছে এই প্রান্তিক সাধকদের উপর। ইনাদের চাওয়া খুব বেশী না, ইনারা পয়সা-ক্ষমতার জন্য লালায়িতও নন। তবু আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে। তাই নয় কি?

অসীম কুমার বিশ্বাস, দক্ষিণবঙ্গের বিশিষ্ট কীর্তনীয়া ও লোককবি। অসীম সরকার নামেই যিনি সমধিক পরিচিত। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলাধীন মাউলী গ্রামে তাঁর নিবাস। জন্ম ১৩৫০ বঙ্গাব্দের ১২ই ফাল্গুন, রবিবার, লোহাগড়া উপজেলার কোলা দিঘলিয়া গ্রামে। (উল্লেখ্য এনাদের আদি নিবাস ওখানেই) পিতা: কৃষ্ণধন বিশ্বাস, মাতা: তরঙ্গ বালা বিশ্বাস। শিল্পীর শৈশব-কৈশর ওখানেই কেটেছে। ওখানেরই স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর বিদ্যাশিক্ষার হাতেখড়ি। লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। আর্থিক অনটনের কারণে হাই-স্কুলে ভর্তি হওয়া বা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে শিল্পীর বয়স যখন ১৯ বছর, তখন সপরিবারে চলে আসেন পার্শ্ববর্তী মাউলী গ্রামে। এখানে এসে বা তার আগে থেকেই সান্নিধ্য লাভ করেন উপমহাদেশের অন্যতম কবিয়াল শ্রীমান বিজয় সরকারের সাথে। কারন ঐ সময়ে মাউলীতে বিজয় সরকার মহাশয়ের নিয়মিত বিচরণ ছিল।

কিশোর অসীমের সুরে মোহিত হয়ে বিজয় সরকার ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে, এ একদিন মস্ত বড় শিল্পী হবে। আপাত আমরা 'বড় শিল্পী' বলতে যেটা বুঝি তিনি হয়তো তা হননি বা সেভাবে তাঁর উপরে আলোটা পড়েনি। তিনি সাধুসঙ্গ করেছেন, ঘুরেছেন, হেঁটেছেন দক্ষিনাঞ্চলের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত! চেয়েছেন, বুঝেছেন মানুষের মূল কোথায়। তিনি মতুয়া প্রভাবিত ফলে তাঁর গানে হয়তো খুব বেশী তত্ত্ব কথা নেই কিন্তু মানুষের কথা আছে বিস্তর।

'যতই সাধুসঙ্গ কর মন, মনকে খাটি করোনাই কখন
অন্তরে অনিষ্ট চিন্তা থাকে সর্বক্ষন
তুমি নিজেকে না করে শাসন,পরকে করাও বনভোজন'!

মাত্র ৭বছর বয়সে প্রথম গান রচনা করেন অসীম বাবু। এ পর্যন্ত তিনি ভাটিয়ালী গান লিখেছেন ৬০০ এর কাছাকাছি, হরিচাঁদ ঠাকুরের গান ১১০টি, সংলাপ নির্ভর গান ৮০টি, অষ্টক গান ৩০টি, ত্রিনাথ ঠাকুরের গান ১২টি, সারি গান ১০টি, হালোই গান ৮টি, যাত্রাপালা ২খানা। এছাড়া পদ্যছন্দে আরো তিনখানি ছোট বই। তিনি নিজে লিখেন, সুরও নিজে করেন। অসম্ভব সুরেলা ও দরাজ কন্ঠের অধিকারী অসীম বাবু। অনেকবার কীর্তনের দল গড়েছেন। তবে শিল্পী মন, ব্যবসায়ী দিক ভালোভাবে বুঝতে না পারায় আর্থিক কারনে দলগুলি ধরে রাখতে পারেননি। তবে তাঁর দলে গান গেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী।

তিনি এবঙ্গের আদম, এ মাটির সন্তান। তিনি নিজে নিম্নবর্ণের মানুষ ফলে এই মাটির কথা এই মাটির মানুষের কথা, এ মাটির আদমের-মরমীবাদের কথা তাঁর গানে ফুটে উঠেছে অহরহ। আমাদের বাউল-লোক কবিরা ব্যাপকভাবে সহজিয়া, সুফী, বৈষ্ণব প্রভাবিত। অসীম সরকার নিজেও তার ব্যতিক্রম নন। এই গানে তার প্রমান মেলে।

'মূর্শিদেরই করুনায় যে জন হলো ইমানদার
নামাজ-রোজা- হজ্ব আর যাকাত সার হয়েছে তার
অসীম বলে জীবন ভরে করে গেলাম ভুল
আমিত্বের বাজারে ঘুরে হারালাম দু'কুল'

জাতপাতে বাউলেরা, লোককবিরা বিশ্বাস করেন এরকম আমাদের চোখে পড়েনা। সে লালন, হাসন, দুদ্দু, রাঁধারমন থেকে হালের ভবা পাগলা যাদের কথাই বলুন সকলেই এই ব্যাপারে প্রায় একধারা। অসীম সরকার এঁদেরইতো উত্তর পুরুষ তাই না! দেখুন এই গানে তিনি কি বলেছেন,

'আমার ছোঁয়া লাগলে তোদের যাবে জাতি কুল
হয়তো তোদের সাধন মার্গে পড়ে যাবে ভুল
অসীম কয় মন ভাবিলে কি হয়
করে গেলি মিথ্যারে আশ্রয়'!

চরম দারিদ্র ও যথাযথ প্রচারের অভাবে এখনো পর্যন্ত তিনি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারেননি। তিনি বৃহত্তর যশোর, ফরিদপুর, খুলনার গ্রাম-গঞ্জে তাঁর সুর সুধা বিতরণ করেছেন বা করে যাচ্ছেন। একবার সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে পল্লীগীতি পরিবেশন করার। নড়াইল জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিজয়গীতি পরিবেশন করে প্রভূত সুনাম অর্জন করেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর নেতৃত্বে কালিয়া উদিচী শিল্লীগোষ্ঠী বিভাগীয় সম্বেলনে খুলনাতে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবং প্রথম স্থান অর্জন করে।

সঙ্গীত ছাড়া আর কোনো ধ্যান-জ্ঞান তাঁর নেই। অন্য কোনো পেশাও অবলম্বন করেন নি। দরিদ্রতা তাঁর পিছু ছাড়েনি। অর্থের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ও নেই। তাঁর একটাই স্বপ্ন, বেঁচে থাকতে থাকতে তাঁর গানগুলোর একটা রেকর্ডিং বের করা ও তার রচনাগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশ করা।

আমাদের ক্ষমতার জায়গা কম। হ্যা চেষ্টা করলে হবে না সেটা বলবো না। নিজের শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজের অস্তিত্বের শেষ বংশধরদের বেঁচে থাকা দরকার। সেই দরকারের নিমিত্তে আজকের এই লিখা। অসীম সরকারেরা দীর্ঘজীবী হোক, তিনি বা তাঁরা আমাদের ঐতিহ্যের যে পরম্পরা রেখে যাচ্ছেন সেটাকে সংরক্ষন করার দায় আমাদের। আমাদেরকে সেই কাজ করতে হবে। ভালো থাকুক আমাদের পূর্বপুরুষেরা, ভালো থাকুক তাঁহাদের কম্ম, ধম্ম!

লিখাটিতে তথ্য সহযোগিতা নেয়া হয়েছে মাউলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক,লেখকের বাল্যবন্ধু রাজীব রায়ের(রাজু) কাছ থেকে। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত