x

এইমাত্র

  •  গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় নতুন সংক্রমিত ৩১৬৩ জন, মৃত ৩৩ জন
  •  বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপ-নির্বাচন আজ
  •  মহামারি করোনাভাইরাসে বিশ্বব্যাপী মৃত্যু ৫ লাখ ৭৫ হাজার, আক্রান্ত ১ কোটি ৩২ লাখেরও বেশি
  •  ঈদে সরকারি-বেসরকারি চাকুরেদের আবশ্যিকভাবে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ
  •  চট্টগ্রামে সাহেদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মাসাৎ মামলা

ভাস্কর নভেরা আহমেদ

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০১৯, ১২:৩৪

১.
আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ, অগ্রণী বাঙালি নারী ভাস্কর নভেরা আহমেদ। তিনি বাংলাদেশের ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম অগ্রদূত এবং প্রথম বাংলাদেশী আধুনিক ভাস্কর হিসেবে আলোচিত। পঞ্চাশের দশকে ভাস্কর হামিদুর রহমানের সাথে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করছিলেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ভাস্কর নভেরা আহমেদকে একুশে পদক প্রদান করে। বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে নভেরা আহমেদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অসাধারণ প্রতিভাধর ও ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বাঙালি শিল্পী নভেরা আহমেদের সঠিক জন্ম সাল নিয়ে বিভ্রান্তি কাটেনি বলেই অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যথাযথভাবেই উল্লেখ করছেন, ‘বেশিরভাগ সূত্র তাঁর জন্মসাল উল্লেখ করে ১৯৩০, অন্য সূত্র বলে ১৯৩৫, এমনকি ১৯৩৯ সালও। তবে যেহেতু তিনি ১৯৪৭ সনের দিকে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন, অনুমান করা যায়, তখন তাঁর বয়স পনেরো বা তার বেশি হতেই পারত।’ সুতরাং সালের মতান্তর থাকলেও তারিখটি নিয়ে বিভ্রান্তি দেখি না। আর তাই নভেরা আহমেদ ১৯৩০ সালের ২৯ মার্চ বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বলে ধরে নিতে পারি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে প্যারিসে বসবাস করছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আশির কাছাকাছি বলেই উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, বেশ কয়েক দশক ধরে অন্তরালে থাকা নভেরা আহমেদ প্যারিসে নিজের বাড়িতে ২০১৫ সালের ৬ মে মঙ্গলবার ভোরে মারা যান। 

২.
নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের শিল্পকলা তথা ভাস্কর্য শিল্পের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং পাকিস্তানি মৌলবাদী ভাবাদর্শের কারণে ভাস্কর্য চর্চার অনুপস্থিতির পর ষাটের দশকে আকস্মিক বিস্ফোরণের মতই নভেরার উত্থান ঘটে এদেশের শিল্পাঙ্গনে। আধুনিক ভাস্কর্য চর্চাই ছিলো তার সকল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। সেই ষাটের দশকের পিছিয়ে পড়া সময়ে কীভাবে একজন ভাস্কর মহিলা হয়ে সমাজের হাজার বাধাবিপত্তিসহ সোনালি ফসল ফলিয়ে গেছেন এককভাবে, তা ভাবলেই অবাক হতে হয়। তার অপার ক্ষমতা, শিল্পবোধ, শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ তন্ময়তা ও ভালোবাসা, অনুভূতি ও নান্দনিকতা_ সব এক হয়ে দৈবের ওপর ভর করেছিল যেন। এতদিন পর তাই, তার কৃত শিল্পসৃষ্টি দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এখনো তা সাম্প্রতিক ও সময়ের সঙ্গে টিকে থেকে তা হয়ে গেছে ধ্রুপদী গুণবিশিষ্ট। ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে জীবনের অর্থ ও সত্যের অন্তর্দৃষ্টিময় স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন নভেরা।

৩.
নভেরার সৃজন শিল্পকে ঘিরে অবতার যে পর্দা উঠেছিল, ১৯৯৪ সালে সে পর্দা তুলে ফেলেন হাসনাত আবদুল হাই সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদসংখ্যায় 'নভেরা' লিখে। নভেরা প্রত্যাবর্তন করেন নতুন প্রজন্মের আইকন হয়ে, পুনর্জন্ম ঘটে তাঁর ভাস্কর্যের। ওই বছরেরই ১০ নভেম্বরে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীতে মেহবুব আহমেদ লেখেন 'ভাস্কর নভেরা আহমেদ'। আর রাষ্ট্রযন্ত্রও যেন নিভৃতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান চেয়েছিল নভেরাকে মৃত বানাতে, কিন্তু তাদের সে আকাঙ্ক্ষারই মৃত্যু ঘটে ১৯৯৭ সালে নভেরা আহমেদকে একুশে পদকে ভূষিত করা হলে। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৯৭ সালের ১৭ অক্টোবরে (বর্ষ ২৯, সংখ্যা ২২) প্যারিসের বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সিলর হিসেবে কর্মরত লেখক ইকতিয়ার চৌধুরী 'নভেরার ঠিকানা : প্যারিস' নিবন্ধটি লেখার পর তাঁর অবস্থানও নিশ্চিত হয় সবার কাছে। ১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্যারিসে সাক্ষাতের বাসস পরিবেশিত খবরে নভেরার পরিচিতি ‘ভাস্কর’ নয়, ‘স্থপতি’ লেখা হয়েছিল। 

৪.
বলা হয়ে থাকে, নভেরার শিল্প অন্বেষণ তাঁর রহস্যময়তারও স্রষ্টা। নদীর তীরে তীরে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন তিনি, ঘুরেছেন মাজারের পর মাজারে, হৃদয়-মনন-সৃজন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন বৌদ্ধদর্শন ও বৌদ্ধশিল্পকে, সমসাময়িক শিল্পী ও শিল্পানুরাগীদের শিল্পভাবনাকে। আর এই পরিভ্রমণের মধ্যে দিয়ে জন্ম দিয়েছেন রহস্যময়তারও-যা তুঙ্গে ওঠে তাঁর স্বেচ্ছানির্বাসনের ফলে। প্যারিসে ২০১৪ সালের শুরুর দিকে তাঁর সর্বশেষ ও রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনীর বিভিন্ন আলোকচিত্র থেকে স্পষ্ট, সৃজনশীল থাকলেও তাঁর শিল্পচর্চা নতুন কোনো মাত্রা পায়নি আর। সেটি বোধ হয় সম্ভবও ছিল না তিনি গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায়। এসব অপূর্ণতা থাকার পরও নভেরাই আমাদের ভাস্কর্য শিল্পের পথিৃকৎ, ভাস্কর্যে অ্যাবস্ট্রাকশনের জনক, প্রতিবেশ উপযোগী উপকরণ ব্যবহারের সূত্রধর এবং পরিণত সংবেদনশীলতা ও শিল্পভাবনাসম্পৃক্ত ভাস্কর। বৈপরীত্য-কী শিল্পচিন্তার, কী জীবন যাপনের-শিল্প অন্বেষণের অমোঘ প্রকাশ। নিজেকে ঘিরে তিনি যে রহস্যময়তা সৃষ্টি করে গেছেন, তা সেই অন্বেষণেরই প্রকাশ। যদিও তার মধ্যে দিয়ে তিনি ক্রমেই রূপকথা হয়ে উঠেছেন, রূপকথার অসংখ্য সংস্করণ তৈরির ঝুঁকি তৈরি করেছেন, কিন্তু তার মৃত্যুকে পরিণত করেছেন শিল্পে। সময়ের জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠা নভেরাকে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা তাঁর সৃজনশীলতায় কোনো যতি টানতে পারেনি। কিন্তু ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে স্ট্রোকের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য নাজুক হয়ে পড়ে। তারপর থেকে আমৃত্যু তিনি হুইল চেয়ারে বসেই চলাফেরা ও তাঁর কাজকর্ম করেন। তবে শরীর দুর্বল হলেও তাঁর প্রবল মনোবল ছিলো অক্ষুণ্ন। আর তাই বই পড়া ও ধ্যান- এসবের মধ্য দিয়ে তাঁর দিনের অনেকটা সময় কাটত। তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন রবীন্দ্রনাথে, আর বৌদ্ধ দর্শনে পেয়েছেন আত্মার প্রশান্তি।

৫.
নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে হামিদুর রহমানের সহযোগী ছিলেন। শহীদ মিনার প্রধান স্থপতি যে নভেরা আহমেদ, এই কৃতিত্বটুকু দিতে আমাদের অনেকেরই দ্বিধা। তাঁকে ব্রাত্য করে রাখতে চেয়েছেন সংকীর্ণ মনের মানুষেরা। কিন্তু নভেরা তো আমাদের শিল্পকর্মের ইতিহাসে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন, থাকবেনও। নভেরা আহমেদের অনন্য কৃতিত্ব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়ন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সুপারিশে শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনি এ কাজে যুক্ত হন। তারা একসঙ্গে কাজ করতেন। নির্মাণস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় তার কোনো ক্লান্তি ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে সম্ভবত তিনি অন্তর্মুখী ছিলেন। এ মহতী উদ্যোগে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের কাছে তিনি কদাচিৎ গেছেন। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর হৃৎকলমের টানে সংকলনটিতে এ-প্রসঙ্গে কয়েকবার লিখেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘… হামিদুর রহমান চিত্রকর, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনাকারী শিল্পী দু’জনের একজন, অপরজন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… মনে পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত আমরা একেবারেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিও বা কেউ জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম, খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন – হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… কিছুদিন আগে শিল্পী হামিদুর রহমান… ঢাকায় এসে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার দেন… এ সাক্ষাৎকারে হামিদ নভেরার নাম করেননি। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দফতরের একটি প্রামাণ্যচিত্রেও হামিদের বক্তব্য আমরা শুনেছি শহীদ মিনার সম্পর্কে, কিন্তু তাকে শুনিনি নভেরার কথা উল্লেখ করতে।…’ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর হৃৎকলমের টানে সংকলনটিতে এ-প্রসঙ্গে কয়েকবার লিখেছেন। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘… হামিদুর রহমান চিত্রকর, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিকল্পনাকারী শিল্পী দু’জনের একজন, অপরজন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… মনে পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশা করেছিলেন যে দু’জন তাদের একজনের কথা আমরা একেবারেই ভুলে গিয়েছি। প্রথমত আমরা একেবারেই জানি না এই মিনারের নকশা কারা করেছিলেন, যদিও বা কেউ জানি তো জানি শুধু শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম, খুব কম লোকে চট করে মনে করতে পারে যে হামিদের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন – হামিদের সঙ্গে ছিলেন বলাটা ভুল, বলা উচিত দু’জনে একসঙ্গে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রূপটি রচনা করেছিলেন। অপর সেই ব্যক্তিটি হচ্ছেন নভেরা আহমেদ।’ সৈয়দ হক আবার লিখছেন, ‘… কিছুদিন আগে শিল্পী হামিদুর রহমান… ঢাকায় এসে টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকার দেন… এ সাক্ষাৎকারে হামিদ নভেরার নাম করেননি। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দফতরের একটি প্রামাণ্যচিত্রেও হামিদের বক্তব্য আমরা শুনেছি শহীদ মিনার সম্পর্কে, কিন্তু তাকে শুনিনি নভেরার কথা উল্লেখ করতে।…’

৬.
নভেরা আহমেদের বাবার নাম সৈয়দ আহমেদ। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদীঘির উত্তর পাড়া। নভেরা কলকাতার লরেটো স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। পরবর্তী শিক্ষার জন্য তাঁকে বাড়ি থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, তিনি আইনে উচ্চতর শিক্ষা নেবেন। তবে শৈশব থেকেই শিল্পানুরাগী নভেরার ইচ্ছা ছিল ভাস্কর্য করার। তিনি সেখানে সিটি অ্যান্ড গিল্ডস্টোন কার্ভিং ক্লাসে যোগ দেন। পরে ভর্তি হন ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসে। সেখান থেকে তিনি পাঁচ বছর মেয়াদের ডিপ্লোমা কোর্স করেন। এরপর তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে ভাস্কর্য বিষয়ে শিক্ষা নেন। নভেরা আহমেদ দেশে ফেরেন ১৯৫৬ সালে। সে সময় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ চলছিল। ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে নভেরা আহমেদ শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। পরে অজ্ঞাত কারণে শহীদ মিনারের নির্মাতা হিসেবে তাঁর নামটি সরকারি কাগজে বাদ পড়ে যায়।

৭.
নভেরার প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে। ‘ইনার গেজ’ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীটি কেবল নভেরারই নয়, গোটা পাকিস্তানেই ছিল কোনো ভাস্করের প্রথম একক প্রদর্শনী। তাতে ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল ৭৫টি। প্রদর্শনীতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, লাহোরের পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সম্পাদক ও প্রখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, লাহোর আর্ট কলেজের উপাধ্যক্ষ শিল্পী শাকির আলীসহ বহু বিদগ্ধজন উপস্থিত ছিলেন। আধুনিক শিল্পধারায় রচিত নভেরার ওই শিল্পকর্মগুলো বিপুল সমাদর পায়। নভেরা আহমেদ এ দেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। সেই প্রদর্শনীর ৩০টি ভাস্কর্য পরে জাতীয় জাদুঘর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। সেই শিল্পগুলো নিয়ে ১৯৯৮ সালে তারা একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করে। নভেরার সেসব ভাস্কর্যের কয়েকটি এখনো জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে স্থাপিত রয়েছে। নভেরার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী হয় ১৯৭০ সালে, ব্যাংককে। এতে তিনি ধাতব মাধ্যমে কিছু ভাস্কর্য করেন। তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী হয় প্যারিসে, ১৯৭৩ সালে রিভগেস গ্যালারিতে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে প্যারিসে তাঁর পূর্বাপর কাজের এক শ দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী হয়।

৮.
ভাস্কর শিল্পী নভেরা আহমেদের জীবন নিয়ে কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই লিখেছিলেন আলোচিত উপন্যাস ‘নভেরা’। হাসনাত আবদুল হাই নভেরা আহমেদের প্রয়াণের পরে ‘নভেরাকে নিয়ে লেখা’ শিরোনামে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখেছিলেন। সেটি পাঠ করা যাক।–‘ নভেরাকে, নভেরা আহমেদকে যখন আমি দেখি সেদিন ভাবতেও পারিনি যে, তাকে নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য একটি উপন্যাস লিখবো এবং সেই উপন্যাস পাঠকপ্রিয় হবে। দেখা গেল অনেকেই নভেরা সম্পর্কে জানতো না, তার নামও শোনেনি। আমার উপন্যাস তাদেরকে এক অসাধারণ নারীর সঙ্গে পরিচিত করালো। তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষ স্পর্শ করলেন। তাকে নিয়ে কৌতূহল আর আগ্রহের অবধি থাকলো না। অনেক প্রশ্ন উঠলো তাকে ঘিরে। সব উত্তর আমার এখনো জানা নেই। পঁচাশি বছর বয়সে একজন মৃত্যুবরণ করার পর সেসব প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে গেল। তিনি হয়ে রইলেন কিংবদন্তির চরিত্র। তাকে নিয়ে মিথ তৈরি হয়েছে। হয়তো আরও হবে ভবিষ্যতে। ইতিহাস আর মিথ_ এই দুইয়ের ভিত্তিতেই পরিচিত হয়ে থাকবেন আমাদের প্রথম ভাস্কর নভেরা আহমেদ। 
তাকে আমি প্রথম দেখি উনিশ শ' ষাট সালে, ঢাকায় চারুকলা কলেজের সামনে। কয়েকজন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে নিঃসংকোচে ঘুরছিলেন। মুগ্ধ হয়েছিলাম তাকে দেখে। মুগ্ধ হবার মতোই ছিলেন তিনি। দেখতে সুন্দরী, সাজসজ্জা-বেশভূষায় অনন্যা, আচরণে রুচিশীল! সাদা শাড়ির সঙ্গে তার গায়ের রঙ মিশে গিয়েছিল। এমন ফর্সা ছিলেন তিনি। চুলের ঝুঁটি বেঁধে সন্ন্যাসিনীর মতো মাথার ওপর তুলে রেখেছিলেন। গলায় ছিল রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে লম্বা টিপ। সব মিলিয়ে শান্ত সমাহিত তাপসী এক নারীর ছবি। খুব উচ্ছল বা বাচাল মনে হয়নি। বরং ছিল সংযমী, পরিশীলিত এক ব্যক্তিত্বের প্রতিভূ। মুগ্ধতা, প্রশংসার পাশাপাশি জেগে উঠেছিল শ্রদ্ধার অভিব্যক্তি। 
এর কিছুদিন পর তার ভাস্কর্যের একক প্রদর্শনী হলো। আমরা বন্ধুরা গেলাম দেখতে। অভিনব ধরনের সব কাজ। ফিগার নিয়ে কাজ করেছেন কিন্তু সবই অর্ধ বিমূর্ত। মা ও শিশু, গরু, দম্পতি এসব কাজ ছিল ফিগারেটিভ কিন্তু স্টাইলাইজড। মাঝখানে বড় গোলাকার শূন্যতা কাজগুলোকে অভিনবত্ব দিয়েছিল। হেনরি মুরের কিছু প্রভাব ছিল কিন্তু মুরের মূর্তির মতো স্থূল নয়। বেশ নম্র, পাতলা আকার। এক ধরনের নিরিবিলি পথ ছিল সেসব কাজে। আমরা তার কাজ যতটা দেখেছি তার চেয়ে বেশি দেখেছি তাকে। খুব সাধারণ বেশভূষায় অপরূপ দেখাচ্ছিল। সেদিন পরেছিলেন কালো রঙের শাড়ি। চুল মাথার ওপর একইভাবে চুড়ো করে বাঁধা। গলায় সন্ন্যাসিনীর রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে দীর্ঘ কালো টিপ। সেদিন তাকে আরও স্মার্ট দেখাচ্ছিল। স্মার্ট কিন্তু উচ্ছল নয়। বেশ সংযত হয়ে চলাফেরা করছিলেন; কথা বলছিলেন অনুচ্চ স্বরে। সবকিছুতেই পরিমিতি বোধ।
আমরা জানলাম, তিনি ভাস্কর হলেও ঢাকা আর্ট স্কুলের ছাত্রী নন। সবকিছু নিজে শিখেছেন। এতে শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল। বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের একজন মেয়ে শিল্পচর্চা করছেন, তাও আবার রক্ষণশীল সমাজে; আমাদের বিস্ময়ের অবধি ছিল না। তার কাজ, বেশভূষা, আচার-আচরণ বলে দিয়েছিল তিনি সমাজের প্রচলিত সংস্কারের বিরুদ্ধে। নিজের অভিরুচি অনুযায়ী জীবনযাপন করছেন। সেই নৈতিক শক্তি তাঁর ব্যক্তিত্বকে দৃঢ়তা দিয়েছিল, অনন্য করে তুলেছিল। ফাস্ট ফরওয়ার্ড ১৯৯৪ সাল। এলিফ্যান্ট রোডে 'অরুণিমা' নামে সরকারি আমার ফ্ল্যাটে আড্ডা হচ্ছে শিল্পী-সাহিত্যিক বন্ধুদের সঙ্গে। অন্যান্যের মধ্যে হঠাৎ শিল্পী আমিনুল ইসলাম বললেন, নভেরাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লেখেন না।
নভেরা! আমি বিস্মিত চোখে তাকালাম। 
হ্যাঁ, নভেরা। বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর। শোনেননি তার নাম? বললাম, শুনেছি। দেখেছিও স্বল্প সময়ের জন্য। সে তো অনেক আগের কথা। প্রায় চলি্লশ বছর হবে। কিন্তু তার সম্পর্কে কিছুই জানি না। উপন্যাস লিখবো কেমন করে? কোনো বইপত্র প্যামফ্লেট আছে তার ওপর?
আমিনুল ইসলাম বললেন, তেমন কিছু নেই। শুধু একটা প্রদর্শনীর ব্রোশিউর আছে আমার কাছে। একটা ব্রোশিউর দেখে উপন্যাস লেখা যাবে না। আমি মাথা নেড়ে বললাম।
শুনে আমিনুল ইসলাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, যারা তাকে চিনত তাদের ইন্টারভিউ নিন। তাদের মুখ থেকে শুনুন তার সম্বন্ধে। এই সব তথ্যের ভিত্তিতে লিখুন। আপনি পারবেন।
কারা কারা চিনতেন তাকে? তাদের মধ্যে ক'জনকে পাব ইন্টারভিউ নেবার জন্য?
আমিনুল ইসলাম নড়েচড়ে বসলেন। হেসে বলেন, প্রথমে আমাকে দিয়েই শুরু করবেন। তার পর আছে নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, ফিল্ম ডিরেক্টর খান আতাউর রহমান, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, কবি শামসুর রাহমান। তাদের কাছ থেকে আরও অন্যের নাম পেয়ে যাবেন। হবে না? আমি অনিশ্চিতভাবে মাথা নেড়ে বললাম, নির্ভর করবে কতটা খুলে বলবেন তারা!
আমিনুল ইসলাম বললেন, তারা বলবেন। তারা প্রত্যেকেই নভেরার বন্ধু এবং ভক্ত ছিল। নভেরার সঙ্গে কারো তিক্ততার সম্পর্ক ছিল না।
ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু হলো। কথামতো আমিনুল ইসলামকে দিয়েই শুরু। তিনি ফ্লোরেন্সে নভেরার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাটা শোনালেন। যেখানে তিনি পড়ছেন, হঠাৎ একদিন নভেরা তার বন্ধু শিল্পী হামিদুর রহমানকে নিয়ে হাজির। তারা তার সঙ্গে থাকতে চান কয়দিন। আমিনুলের আপত্তি ছিল না, কিন্তু সমস্যা হলো ঘর মাত্র একটা। সেই এক ঘরে একটি নারী, দুটি পুরুষের একসঙ্গে থাকার গল্প যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনি চমকপ্রদ। ফ্লোরেন্সে সেইভাবে থাকার সময় নভেরা আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রমবোধ বজায় রেখেছিলেন। এর ফলে আমিনুলের কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
আমিনুলের সঙ্গে এর পর নভেরার দেখা এবং সেখানকার অভিজ্ঞতাও চমকপ্রদ। নভেরার সঙ্গে তার এবং অন্যান্য পুরুষ বন্ধুর প্রতিটি সাক্ষাৎই ছিল স্মরণীয়। আমিনুল এমন নিখুঁতভাবে সব বললেন, যেন গতকালকের কথা। সবকিছু স্মৃতিতে ভাস্মর।
আমিনুলের পর খান আতা। তিনি স্পষ্টই বলে ফেললেন যে, তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায়েই রেখেছিল। তার সম্বন্ধে খান আতার মধ্যে উন্নাসিকতা বা অশ্রদ্ধার ভাব ছিল না মোটেও।
সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ছিল নাট্যকার সাঈদ আহমদের সঙ্গে আলাপ। তিনি ঢাকাইয়া ভাষায় রসিয়ে রসিয়ে সবকিছু বললেন। একটু পরপরই হাসি। তার কাছে নভেরা ছিলেন একজন কৌতুকের পাত্র। তার বড় ভাই শিল্পী হামিদুর রহমানের নিকট-বান্ধবী হলেও নভেরাকে নিয়ে রসিকতা করতে ইতস্তত করেননি তিনি। কিন্তু নভেরা সম্বন্ধে অশ্রদ্ধার ভাব দেখাননি একটুও।
নভেরার পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেল লুতফুন নামে এক মহিলার কাছ থেকে। তিনি নভেরার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। বোনদের সঙ্গে নভেরার সম্পর্ক নিয়ে তিনি যা বললেন তা বেশ বিশদ। কিছু সমালোচনা ছিল সেই মন্তব্যে ও তথ্যে। নভেরার বোনদের মধ্যে কেউ ঢাকায় ছিলেন না। থাকলে ক্রস চেক করে নেওয়া যেত। ওপরের ব্যক্তিরা ছাড়াও আরো কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলো। 
সব ইন্টারভিউ শেষে তথ্য সময়ের ক্রম অনুসারে সাজিয়ে লিখে ফেললাম। প্রতিটি অধ্যায়ের জন্য ব্যবহার করলাম ভিন্ন আঙ্গিক। সিনেমার স্ক্রিপ্ট, নাটক, ডায়েরি, স্মৃতিকথা, স্বগত সংলাপ- এই সব ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে লেখা হলো অধ্যায়গুলো। তথ্যের অভাবে তার জীবন সম্বন্ধে যতটা বলা গেল, শিল্পকর্ম সম্বন্ধে ততটা বিশদভাবে লেখা গেল না। তবু মোটামুটি একটি ধারণা দেওয়া গেল।
উপন্যাসটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হওয়ার পর নভেরার বড় বোনের স্বামী এসে জানালেন যে, তার স্ত্রীর বোন সম্বন্ধে যা লেখা হয়েছে তা সঠিক না। তার মন্তব্য আকারে লিখে পাঠাতে বললাম। বই আকারে প্রকাশের সময় সেই মন্তব্য পরিশিষ্ট আকারে সংযোজন করা হলো। শহীদ মিনার নির্মাণে নভেরার ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক সে সম্পর্কেও পরিশিষ্টে সাঈদ আহমদের মন্তব্য যোগ করা হলো।
উপন্যাসটি প্রকাশের বহু বছর পর জানতে পারলাম, নভেরা জীবিত এবং প্যারিসে বসবাস করছেন। একবার প্যারিসে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলাম। তিনি দেখা করলেন না। জানলাম, তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না। বাংলাদেশের শিল্পী ও সমালোচকদের সম্বন্ধে তার বেশ অভিমান ছিল। একজন স্পর্শকাতর শিল্পী হিসেবে এমন অভিমান থাকা স্বাভাবিক। আমি নভেরা উপন্যাসটি লিখতে পেরে আনন্দ লাভ করেছি।’

৯.
এ দেশের সাংস্কৃতিক চিত্রপটে নভেরা আহমেদ আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রবলভাবে। মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে, নারী হিসেবে। সংস্কারাচ্ছন্ন সে যুগে তিনি হাত দিয়েছিলেন ভাস্কর্যের মতো অচর্চিত শিল্পমাধ্যমে। সে স্পর্শ ছিল পরশপাথরের মতো। তাঁর হাত ধরে এ দেশের ভাস্কর্যের শুরুটাই হলো আধুনিক ভাষায়। স্বাতন্ত্র্যে মণ্ডিত তাঁর জীবনও প্রথা মানেনি। প্রবল আবির্ভাবের বিপরীতে নভেরা নিভৃতেও চলে গেলেন নিশ্চুপে। প্যারিসে এই শিল্পীকে নিয়ে ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’ শিরোনামে অন্তরঙ্গ স্মৃতিচারণা করেছেন আনা ইসলাম। সেটি পাঠ করা যাক।

৯.১
‘প্রচণ্ড ইগো ছিল নভেরা আহমেদের। হাসপাতালে যদি যেতে হয়েছে কখনো, কাউকে দেখতে যেতে বলেননি। সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। এবারই প্রথম তিনি বললেন, আমি যেন তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যাই। দেখলাম, শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়। সারা শরীরে নল। খেতে পারছেন না একদম। তরল কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। রেবতী- মরিশাসের মেয়ে, নভেরার দেখভাল করছেন। আমাকে দেখে নভেরা হাসলেন একটু। বললেন, ‘অনেক কথা বলার আছে।’
আমি বললাম, ‘সুস্থ হয়ে নিন। আমি আপনার বাড়িতে আসব।’
তিনি মাথা নাড়লেন। হাসলেন।
চার দিন পর। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন, হাসপাতালে নয়, বাড়িতেই চালানো যাবে চিকিৎসা। এরপর নভেরার স্বামী গ্রেগোয়া আমাকে ফোন করলেন। তিনি বললেন, ‘শেষ দেখা দেখতে চাইলে আসেন।’
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, ‘আজ আসব?’ সেদিন সোমবার।
‘না। কাল মঙ্গলবার আসেন।’ বললেন গ্রেগোয়া।
প্রতিবারই আমাকে নিতে স্টেশনে আসেন গ্রেগোয়া। ৫ মে, সকালে তাই গ্রেগোয়াকে ফোন করে বললাম, ‘কটায় স্টেশনে আসবেন আপনি?’
মৃদু স্বরে গ্রেগোয়া বললেন, ‘ও চলে গেছে।’
দ্রুত পৌঁছালাম শঁন পামেল গ্রামে নভেরার বাড়িতে। প্যারিস থেকে তা ৬৭ কিলোমিটার দূরে। শাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগত শোক একেবারেই সহ্য করতে পারে না। ও আসেনি। আমি এসেছি আমার মেয়ে চিত্র সিঁথিকে নিয়ে। বরাবরের মতোই স্টেশনে নিতে এসেছিলেন গ্রেগোয়া। বাড়িতে গিয়ে দেখলাম সবকিছু আগের মতোই আছে। আর ওই তো, শুয়ে আছেন নভেরা। ঘুমোচ্ছেন।
পড়শি এক নারী আমাকে দেখেই বুঝলেন, আমি নভেরার স্বদেশি। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন তিনি। রেবতী আর আমার মেয়েও ধরে রাখতে পারল না চোখের পানি।
ভেতরের ঝড়কে বুঝতে না দিয়ে শান্ত থাকার ভান করে গ্রেগোয়া ওয়ার্ডরোব থেকে একে একে নামাচ্ছেন নভেরার জামাকাপড়। শেষযাত্রায় কোন পোশাকটা মানাবে ভালো, তা নিয়ে ভাবছেন। কালো রঙের প্রতি দারুণ আগ্রহ ছিল নভেরার। শেষযাত্রার কি সেটাই উঠবে ওর শরীরে? নভেরা তো দারুণ বর্ণিল জীবন পছন্দ করতেন, তাহলে কি শেষযাত্রার শরিক হবে রঙিন পোশাক? অনেক ভেবেচিন্তে একটা কমলা রঙের জামা বের করা হলো। দারুণ সুন্দর!
বহু আগে বাবা মারা যাওয়ার পর একবার কপালে হাত রেখেছিলাম। মৃতদেহ স্পর্শ করার ওই একটাই অনুভূতি ছিল আমার। এবার আমি স্পর্শ করলাম নভেরার কপাল। হিমশীতল একটি কপাল।
পরদিন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হিমঘরে। তাঁকে সমাধিস্থ করার দিন শিল্পী শাহাবুদ্দিনসহ আমরা আবার গেলাম নভেরার গ্রামে। হিমঘর থেকে তাঁর মৃতদেহ আনতে গ্রেগোয়ার সঙ্গে যাই আমি আর রেবতী। কফিন ছিল প্রস্তুত। কফিনে নভেরার ডান কাঁধের পাশে গ্রেগোয়া রাখলেন তাঁর বাগানের একটি উজ্জ্বল হলুদ গোলাপ, তাঁর শেষ প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ। বাঁ কাঁধের পাশে রাখলেন একটা পাখির মৃতদেহ। এটি সেই পাখি, যে পাখিকে নভেরা প্রতিদিন নিজ হাতে খাওয়াতেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই পাখিও নভেরার সঙ্গে একই দিনে মারা গেছে।
নভেরার কফিন কবরে নামানোর আগে চিত্র সমালোচক ও কিউরেটর প্যাট্রিক আমিন, শাহাবুদ্দিন, ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম ও আমার মেয়ে চিত্র সিঁথি নভেরাকে নিয়ে আলোচনা করেন। প্যারিসপ্রবাসী অনেক বাঙালি শরিক হয়েছিলেন নভেরার শেষযাত্রায়।

৯.২
নভেরার কথা বলা হলে ঘুরেফিরে গ্রেগোয়া দ্য ব্রন্সের কথাও বারবার বলতে হবে। নভেরার স্বামী এই ভদ্রলোক একজন মাটির মানুষ, যেন বাঙালি মানসিকতা নিয়েই জন্মেছেন তিনি। নভেরাকে সমাহিত করার আগে তিনি শুধু বলতে পেরেছিলেন, ‘স্বর্গে আবার দেখা হবে।’ দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘একটাই বিয়ে, একটাই জীবন।’ এ যেন এক বাঙালি স্বামী। আমার মনে পড়ে গেল, গ্রেগোয়ার মাধ্যমেই আমি নভেরার কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

গ্রেগোয়া দুঃখ করে বলেন, ‘খুব ইগো ছিল ওর। নিজে যা বুঝবে, তা–ই করবে, অন্যের কথা আমলেই নেবে না। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন ফিজিওথেরাপি করাতে। করাল না। আমার কথা যদি একটু শুনত, তাহলে হয়তো আরও কয়েকটা বছর বাঁচত।’

গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে আমি প্যারিসে নভেরাকে খুঁজতে থাকি। বাংলাদেশ দূতাবাস, মিনিটেল ঘেঁটে নভেরার সন্ধান করেছি। কিন্তু পাইনি। সে সময় প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘কোথাকার কোন নভেরা, আমাদের কি ওসব মনে থাকে?’ এ কথা আমি কোনো দিন ভুলব না। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি এ রকম উদাসীনতার কথা ভোলা যায় না।

নভেরার স্বামীর একটি বুটিকের দোকান ছিল প্যারিসে। তাঁকে আমি বারবার বলেছি নভেরার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে। কিন্তু নভেরা তখনো ‘অবরোধবাসিনী’। কারও সঙ্গে দেখা করবেন না বলেই যেন পণ করেছেন। গ্রেগোয়ার সঙ্গে পরিচয়ের বছর দুই–আড়াই পর, ১৯৯৭ সালের অক্টোবরে একবার ওই বুটিকের দোকানে গিয়েছিলাম। গ্রেগোয়া ছিলেন না। সেখানে কালো শাড়ি পরিহিত এক নারীকে দেখলাম দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো দেখছেন। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আমি প্রাথমিক সম্ভাষণের পর জানতে চাইলাম, ‘আপনি কি নভেরা?’
আমার নাম বলতেই তিনি চিনলেন। কারণ, গ্রেগোয়া তাঁকে আমার ব্যাপারে বলেছেন। নভেরা বললেন, ‘এসো, এসো।’ নভেরা জানতেন, আমি তাঁকে খুঁজছি। এরপর একটু একটু করে আমার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলেন বাংলাদেশের প্রথম ভাস্কর। জানা গেল বাইজেন্টাইন শিল্পকলা সম্পর্কে তাঁর ভাবনার গভীরতা, নৃত্যশাস্ত্রের প্রতি তাঁর টান।

৯.৩
শহীদ মিনারের মূল নকশাকার নভেরা আহমেদ ছবিতে শহীদ মিনার দেখে আহত হয়েছিলেন। নভেরা ও হামিদুর রহমান যে নকশা জমা দিয়েছিলেন, তাতে মিনারে তিনটি স্তম্ভের নিচের দিকেই হওয়ার কথা ছিল স্টেইন গ্লাসের কাজ। সেখানেই থাকার কথা ছিল হামিদুর রহমানের ফ্রেসকো আর নভেরা আহমেদের করা ছোট ভাস্কর্য। নৈসর্গিক স্থাপত্যের ধারণা দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই আবেদন নিয়ে শহীদ মিনারের কাজটা আর হয়নি।

৯.৪
নভেরা পছন্দ করতেন রসমালাই, রসগোল্লা আর বিরিয়ানি। আমি এই খাবার বানিয়ে নিয়ে যেতাম। তিনি খেতেন তৃপ্তি নিয়ে। খুব পছন্দ করতেন শাড়ি। মূলত প্যারিসেও শাড়ি পরেই থাকতেন। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঢাকা যাচ্ছি, আপনার জন্য কী আনব? বললেন, রাজশাহীর সিল্ক। সবুজ রঙের। সবুজটা ঠিক কী রকম হবে, তাও বুঝিয়ে দিলেন। সেই অনুযায়ী ব্লাউজও বানাতে দিলেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালি এলে শাহাবুদ্দিনের জন্য দেশ থেকে আনা মুড়ি–মোয়া দিয়েছিলেন। তার কিছুটা পেলেন নভেরা। সারাটা দিন আমরা কাটিয়েছিলাম নভেরার সঙ্গে। বাংলাদেশে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলাম। নভেরা ভেবেছিলেন, বাংলাদেশে আসবেন। শহীদ মিনারের পাশে বসে ছবি আঁকবেন। খোঁজ পড়ল নভেরার পাসপোর্টের। দেখা গেল ২০০০ সালেই পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। গত বছরের একটি দিনে আমরা দ্রুত পৌঁছে গেলাম প্যারিসে বাংলাদেশের দূতাবাসে। নভেম্বর পর্যন্ত হাতে লেখা পাসপোর্ট করা যেত। আমরা এক দিনেই জরুরি ভিত্তিতে নভেরার জন্য পাসপোর্ট তৈরি করে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। ফ্রান্সে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা খুব সহযোগিতা করেছিলেন।বাংলাদেশে নভেরা আর আসতে পারলেন না।

৯.৫
প্যারিসে নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্পকর্মের দুই মাসব্যাপী প্রদর্শনী। ৪১ বছর পর শিল্পীর প্রদর্শনী। শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগে ভুগছিলেন শিল্পী। বিশেষ করে মুখে স্বাদ ছিল না বেশ কিছুদিন ধরে। কিছু গিলতেই অসুবিধা হচ্ছিল তাঁর। তরল খাবার ছাড়া কিছুই খেতে পারতেন না। আরেকটা কথা বলেই শেষ করি আজকের লেখা। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে গান গাইল চিত্র সিঁথি, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে’।গানটির দুই পঙ্ক্তি শোনার পরই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন নভেরা। সে দৃশ্য আজও ভুলিনি। নভেরার সঙ্গে মিশেছি তাঁকে ভালোবাসি বলে; তাঁকে নিয়ে কিছু বলতে হবে বা লিখতে হবে বলে নয়। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু ভাস্কর নভেরা আহমেদ আছেন, থাকবেন বহু বহুদিন। শহীদ মিনার তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।’

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, কালি ও কলম, শিল্প ও শিল্পী, সাপ্তাহিক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত