মাফিয়াদের দ্বীপ সিসিলি

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০১৬, ১৯:১৪

সাহস ডেস্ক

ইউরোপ মহাদেশের ছোট্ট দ্বীপ সিসিলি। ইতালি থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি স্থলভাগ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। আয়তন নেই বললেই চলে। লোকসংখ্যা প্রায় ২ হাজার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ দ্বীপটিতে মানব বসতি গড়ে উঠে ১৭৬৮ সালে। সিসিলি দ্বীপের অধিবাসীরা কথা বলে ইতালীয় ও ইংরেজি ভাষায়। লোকসংখ্যা স্বল্প হলেও শিক্ষিতের হার শতকরা ৯২ ভাগ। ইতালির অধীনে থাকা ইউরোপ মহাদেশের এ দ্বীপটি ভূমধ্যসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। 

ইতালির দক্ষিণে সিসিলি বড়সড় একটা দ্বীপ।  তার পাশেই ছোট ছোট কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে এওলিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।  সাধারণ মাপের মানচিত্রে এগুলো চোখেই পড়ে না।  এওলীয় দ্বীপগুলো প্রায় সবই আগ্নেয়গিরি, তার মধ্যে কয়েকটি রীতিমতো জাগ্রত। ক্যাটানিয়া বিমানবন্দর থেকে মাউন্ট এটনা (Mount Etna) দেখেই পর্যটকরা বুঝতে পারেন আগ্নেয়গিরির দেশে এসে পড়েছেন।  প্রচণ্ড গরমেও তার চূড়ার কাছে বরফ জমে আছে। একটা শঙ্কু আকৃতির পাহাড়কে ঘিরে আছে এওলীয় দ্বীপগুলো। অনেক দ্বীপ এত ছোট যে, মনে হয় শুধু পাহাড়টাই সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের চূড়ার কাছে গলগল করে সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বিখ্যাত চারটি দ্বীপ- লিপারি, প্যানেরিয়া, ভলকানো ও স্ট্রম্বোলি। এখানকার ফেরিবোট হল হাইড্রোফয়েল। গতি বাড়লে জলের একটু ওপর দিয়ে যায়। লিপারি দ্বীপের কালো বালির সমুদ্রতট আগ্নেয়গিরির ছাই দিয়ে তৈরি। জলে পা দিলে মনে হবে পা কেটে যাচ্ছে, এত ঠাণ্ডা।

সিসিলি দ্বীপ  আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ার ফলে এই দ্বীপটির কৌশলগত দিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  এ কারণে প্রাচীনকাল হতে নানা জাতির এই অঞ্চল দখল ও আক্রমণ করার কারণে একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এ দ্বীপে।  খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১০০০ বছর আগে ফোনেশিয়ানরা এখানে প্রথম বসতি গড়ে তোলে। এরপর রোমান, বাইজেনটাইন, আরব, নরম্যান একের পর এক বহিঃশক্তি দখল করে এ গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপটিকে। এসব বহিঃশক্তির আক্রমণের মূল কারণ মাউন্ট এটনা (Mount Etna)। কারণ এই এক্টিভ ভলক্যানোর ছাই হতে এ দ্বীপের অধিকাংশ জমি অত্যন্ত উর্বর এবং এই দ্বীপের অবস্থান বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিকরা যখন সিসিলি আক্রমণ করে তখন ফোনেশিয়ানদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। তবে রোমানরা এ অঞ্চল দখল করে এ অঞ্চলের বহুবাদী মতবাদের ওপর প্রথম আঘাত হেনেছিল। এরপর ৯০০ শতাব্দীতে আরব এবং ১১ থেকে ১৩ শতাব্দী পর্যন্ত নরম্যানরা সিসিলি শাসন করে। প্রদর্শনীতে সিসিলির কিছু স্থাপত্য, কয়েন এবং জুয়েলারি স্থান পায়। এ ছাড়া ছিল টেক্সটাইল যা দেখে সহজে অনুমান করা যায় দ্বীপটি বেশ ধনী ও সমৃদ্ধ ছিল। প্রায় ৫০০০ বছর আগেই এ দ্বীপে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এসেছে।  মূলত ইতালি, উত্তর আফ্রিকা ও ফোনেশিয়ানরা ছিল এ অঞ্চলের আদি অধিবাসী। গ্রিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ সালে প্রথম সিসিলি দখল করে। পাশাপাশি তারা ইতালির কিছু অংশও নিজেদের কবজায় নেয়। গ্রিকরা সিসিলি দখলের সময় অন্য জাতের মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ও দ্বন্দ্ব হয়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে রোমানরা সিসিলি দখল এবং ৫০০ বছর দ্বীপটি শাসন করে। রোমানদের উদ্দেশ্য ছিল তারা এই দ্বীপটিকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাবে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সিসিলিতে রোমানদের সময় ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ঢুকে পড়ে। যার কারণে সিসিলির অধঃপতন ত্বরান্বিত হয়।

রোমানদের কারণে সিসিলিতে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। এরপর আরব, স্পেনের মুসলিমরা যাদের কালেকটিভলি সারাসেন বলা হয় তারা সিসিলি দখল করে। আরবরা সিসিলি দখল করার পর তারা আধুনিক চাষাবাদের সূচনা করে। এ দ্বীপে আরবরা অরেঞ্জ, লেমন, শিল্প-সাহিত্যের নানাদিকের সূচনা ঘটায়। আরবদের মাধ্যমে সিসিলি বাণিজ্যের শিখরে উপনীত হয়। তখন সিসিলির রাজধানী ছিল পালেরমো। এ সময় এ অঞ্চলে প্রায় একশর বেশি মসজিদ নির্মিত হয়। সিসিলির ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ছিল অসাধারণ। কেউ কারও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করত না এবং নিজেদের বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দিত না। এই ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ফলে নানা ধর্মের মিলনকেন্দ্র ছিল সিসিলি।  তখন ইউরোপিয়ানদেরও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সিসিলি। তারা এই দ্বীপ দখলের নানা চক্রান্ত শুরু করে। এ সময় ইউরোপের একটি উদীয়মান শক্তি ছিল সাউদার্ন পার্টের নরম্যান্ডি। যারা উত্তর ফ্রান্সে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছিল এবং পরবর্তীতে ইংল্যান্ড দখল করেছিল।

এই নরম্যানরা অবশ্য ফ্রান্সের অধিবাসী নয় বরং তারা ছিল স্ক্যানডেনেভিয়ান ভাইকিংস। তারা ডেনমার্ক থেকে এসে ফ্রান্সের নরম্যান্ডে ঘাঁটি গড়েছিল। নরম্যানরা সিসিলি দখল করার পর অঞ্চলটিতে কোন ধর্মীয় শাসন চাপিয়ে দেয়নি বরং ধর্মীয় স্ব-অবস্থান নিশ্চিত করে। রাজা রজারের সময়কালে দ্বীপটিতে ধর্মীয় স্ব-অবস্থান ছিল। তখন বিভিন্ন সভ্যতার সংমিশ্রণে তৈরি স্থাপত্যের অসাধারণ সব নিদর্শন স্থাপিত হয় এ দ্বীপে এবং গড়ে ওঠে একটি সমন্বিত সংস্কৃতি যা ছিল স্বতন্ত্র।

নরম্যানরা বেশ সমৃদ্ধশালী জীবনব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয় এবং পালেরমো ছিল তখন উন্নয়নের শিখরে। এরপর জার্মান রাজা ফ্রেডরিক, ফ্রান্সের রাজা চার্লস, স্পেনের রাজা পিটার দখল করে এই দ্বীপ। এ সময় ব্যাপক সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে সিসিলির অধিকাংশ নাগরিক দ্বীপটি ছেড়ে অন্যত্র সরে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইতালীয়রা সিসিলিকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা দিয়ে দেশটি নিজ দেশের সঙ্গে একীভূত করে। এ সময় বেশকিছু মাফিয়ার উত্থান হয় এ অঞ্চলে। যার মধ্যে অন্যতম ডন কলজেরো, ভিজিনিসহ আরও বেশ কজন ইতালীয় মাফিয়া। এসব মাফিয়ার দৌরাত্ম্যে সিসিলি মাদকদ্রব্যের অন্যতম ভূ-স্বর্গে পরিণত হয়। তবে বর্তমানে অঞ্চলটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের স্থান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত