অপ্রিয় সত্য বলতে নাই

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০১৬, ১১:৫১

গত রোববার পিকেএসএফের অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু প্রকল্পে টিআর, কাবিখা প্রকল্পে দুর্নীতির প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “আমি তো এমপি আমি জানি, টিআর কীভাবে চুরি হয়। সরকার ৩০০ টন দেয়, এরমধ্যে এমপি সাহেব আগে দেড়শ টন চুরি করে নেয়। তারপর অন্যরা ভাগ করে। সব এমপি করে না। তবে এমপিরা করেন।”

মন্ত্রীসভায় ব্যাপক সমালোচনার কারণে এবং সংসদে সমালোচনায় জড়িয়ে মন্ত্রী মহোদয় তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন ও ক্ষমা চান। কিন্তু এতে ব্যাপারটি মিটলো কি? জনাব হাসানুল হক ইনু প্যান্ডোরের বাক্স খুলেছেন মাত্র, অমনিতেই হুল ফোঁটা শুরু। অপ্রিয় সত্য বলতে নাই, এটি জনাব ইনুর মনে ছিলনা, প্রকারান্তরে সহকর্মীরা চোর বনে গিয়েছে। নানাবিধ অনিয়মে জড়িত থাকা সাংসদরা তা রে রে করে তেড়ে উঠেছেন।

এ সংক্রান্ত সব সংবাদের সাথেই পাঠকদের মন্তব্যে, সংসদ সদস্যেদের সমালোচনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সারা বছর জুড়েই টিআর ও কাবিখা নিয়ে নানান সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রিকায়, একটি সংবাদও প্রশংসা সূচক নয়, অনিয়মের চিত্রে ভরপুর সব। আমাদের সাংসদরা আইন প্রণয়নের জন্য সংসদে গিয়েছেন। মহামাণ্যরা দৌঁড়ুতে থাকেন নানান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নিজ এলাকার। যে সাংসদের দাপট বেশী, তিনি বরাদ্দও পেয়ে থাকেন বেশী।

আজ শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন সাংসদদের চাপে স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ করতে হয়। প্রয়োজন না থাকলেও! কোন কিছুই কোন নীতিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অথচ সাংসদদের নীতিমালা তৈরী করার কথা। কতজনের জন্য স্কুল ও কলেজ হবে? কতটুকু রাস্তা জাতীয় মহাসড়কে সংযুক্ত হবে? উন্নয়নের কাঠামো বিনির্মাণ না করে, মহামাণ্যরা রাজস্ব বাজেটের দিকে হাত বাড়ান। চুড়ান্ত আনুগত্য দেখাতে পারলেই অনেক কর্মীর হাতে মেলে টিআর ও কাবিখার জন্য বরাদ্দ। প্রায় প্রতিজন সাংসদ দুই কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকার বরাদ্দ পেয়ে থাকেন টিআর ও কাবিখার জন্য নিজ এলাকার। এর বাইরে প্রত্যেক সাংসদ বিশ কোটি টাকার বরাদ্দ পান নিজ এলাকার রাস্তা ঘাট ও নানান উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য, যা বাস্তবায়ন করে স্থানীয় প্রশাসন। এর বাইরে সাংসদরা নানান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে থাকেন শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার। আইন প্রনয়ণের জন্য নির্বাচিত হয়ে মহামাণ্যদের, প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দিকে কেন ঝোঁক থাকে? সময় এসেছে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার? সাংসদদের দাপটে স্থানীয় প্রশাসন কোন কাজ করতে পারেনা।

উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোন কাজ নাই। সবকটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত। সাংসদরা যখন বরাদ্দ নিয়ে এলাকায় যান, তখন স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব বর্তায় সাংসদের লোকজনকে কাজটি দেয়ার। এরফলে কাজটি সুসম্পন্ন হয়েছে কিনা সেটি পরখ করা যায়না। মাঝে মধ্যেই স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ার সাংসদের হাতে নিগৃহিত হন, কাজের মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুললে এবং অন্য ঠিকাদারকে কাজ দিলে। এ সমস্ত রাজনৈতিক প্রকল্পের চাপেই তৈরী হতে থাকে, রডের বদলে বাঁশ দেয়া ইকো ফ্রেন্ডলি নানান স্থাপনা। দুর্নিতীপরায়ণ সমাজ গড়ে উঠে রাজনৈতিক সহায়তার হাত ধরেই। টিআর কাবিখার গম উত্তোলনের জন্য কোন বরাদ নাই। পরিবহনের খরচ কি ভূতে যোগাবে? প্রথম থেকেই শুরু হয় অনিয়মের, পরিবহনের খরচ তোলা, যিনি মেপে দেবেন তাঁর মজুরী তোলা, কাজ সংশ্লিষ্ট লোকজনকে তুষ্ট করা, সবই এর মধ্যে। হাতে যা থাকে এর দ্বারা কোন উন্নয়ন ঘটেনা। যা ঘটে তা উন্নয়নের চুনকাম। দেখতে বাহারী লাগে, কাজের বেলায় ঠুনকো। এ নৈরাজ্যকর অবস্থার অবসান প্রয়োজন।

সম্প্রতি আদালত কেড়ে নিয়েছে স্কুল কমিটির সভাপতির পদ মহামাণ্য সাংসদদের হাত থেকে। এ থেকে তাঁরা কি কিছু শিখলেন? ঢাকার দুটো নামকরা স্কুলের অনিয়মের সাথে জড়িয়ে গেছে একজন সাংসদের নাম, তিনি যতটুকু জড়িত, তার চাইতে বেশী জড়িত তাঁর রাজনৈতিক মিত্ররা। ভিকারুননুননিছা স্কুলের ফান্ডের টাকা তুলে নিয়েছেন সাবেক সাংসদ ইকবাল ও ফালু, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নামে। এ টাকা ফেরত পাওয়া গেছে কিনা কে জানে? একই এলাকার একটি স্কুল মগবাজার গার্লস হাইস্কুল। সম্প্রতি এর সভাপতির পদ নিয়েছেন গাজী গোলাম দস্তগীর, যিনি গাজী নামেই পরিচিত। তিনি এলাকার সাংসদ নন, তাঁর নির্বাচনী এলাকা রুপগঞ্জ। স্কুলের পদ অলংকৃত করেই তিনি স্কুল ফান্ডের টাকা নিজ মালিকানাধীন ব্যাংকে সরিয়েছেন। সরকারী সোনালী ব্যাংক থেকে টাকা গেছে যমুনা ব্যাংকে টাকা দু'কোটিরও বেশী।

ঢাকার আরেক সাংসদ জাতীয় পার্টির বাবলা মহোদয় হাত বাড়িয়েছেন ধোলাইপাড় স্কুলের দিকে, সেও ফান্ডের কারণে। কমবেশী সারাদেশের চিত্র একইরকম হবে। ব্যতিক্রম হয়ত আছে, সেটি ধর্তব্যের মধ্যে না। নিজেদের মর্যাদা কাজ করে আদায় করতে হয়। চাপাবাজি ও তোষামোদি দিয়ে ভাবমূর্তি অক্ষুন্য রাখা যাবেনা। রাজস্ব বাজেট স্থানীয় প্রশাসনের জন্যই তোলা থাক। আপনি সাংসদ আইন প্রনয়ণের জন্য গিয়েছেন সেটি করুন এবং দেশ নিয়ে ভাবুন। দেশের আর্থসামাজিক রুপান্তরের কাজে আমরা যাঁদের পাঠিয়েছি, তাঁদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা বিপুল। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখুন, এর জন্যই আপনারা সংসদে। আমরা গ্যাঁড়াকল'এ পড়েছি। এ থেকে আমাদের বেরুতে হবে। এটিই দেশবাসী চায়। আপনার হাতে রাজস্ব বাজেটের কাগজ শোভা পায়না।

লেখক: রাজনীতিবিদ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত